বাবা চেয়েছিলেন, মেয়ের পরিচয়ে পরিচিত হবেন তিনি, লোকে তাকে 'তিশার বাবা' বলে ডাকবে। তিনি আজ নেই, তবে তার সেই স্বপ্ন খানিকটা হলেও পূরণ করেছিল তার মেয়েটা!

বাবা স্বপ্ন দেখেছিলেন তাকে নিয়ে। ব্যবসায়ী এই ভদ্রলোক বেশ আমুদে স্বভাবের ছিলেন, বন্ধুবান্ধবের কাছে তার ভালো জনপ্রিয়তা ছিল। তার ছোট মেয়েটাকে অচেনা কেউ দেখলে জিজ্ঞেস করতো, ‘তুমি এনামুল হক সাহেবের মেয়ে?’ বাবা চেয়েছিলেন, একদিন মেয়েটার পরিচয়ে সবাই তাকে চিনবে। এনামুল হক নামের মানুষটা গত হয়েছেন অনেক আগে। মেয়ের সাফল্যের শীর্ষে ওঠাটা তিনি দেখে যেতে পারেননি পুরোটা, কিন্ত জীবনের শেষ কিছুদিনে হলেও লোকে তাকে চিনেছে ‘তিশার বাবা’ বলে, এটাই হয়তো তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় একটা প্রাপ্তি হয়ে গিয়েছিল। 

নুসরাত ইমরোজ তিশা, টেলিভিশনের অতি অতি অতি পরিচিতমুখ, বাংলা নাটকে যার সীমাহীন জনপ্রিয়তা, যার অভিনয়ের তুলনা হয়তো তিনি নিজেই। সময়ের সবচেয়ে মেধাবী অভিনেত্রী বললে একটুও ভুল হবে না, নিজের প্রতিভার গুণেই যিনি মানুষের মনের রাজ্যপাট জয় করেছেন। শুরুটা বিটিভির নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠান দিয়ে। বাবার আগ্রহেই সেখানে অংশগ্রহণ করা। প্রথমবার আবৃত্তিতে নাম লিখিয়েছিলেন, তখন বয়স খুবই কম। ভুলভাল একটা কবিতা কোনরকমে বলে দিয়ে এসেছিলেন, সেই ভুল কবিতা আবৃত্তি শুনেও বাহবা দিয়েছিলেন বিচারকেরা। এরপর প্রস্ততি নিয়ে গেলেন, আর করলেন বাজীমাত। আধুনিক গান, ছড়াগান, দেশাত্ববোধক গান, নাচ, গল্প বলা- সবগুলো বিভাগে চ্যাম্পিয়ন একজন, তার নাম নুসরাত ইমরোজ তিশা! 

১৯৯৫ সালে নতুন কুঁড়ির গোল্ডকাপটা উঠলো তার হাতে। ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলে পড়া চুপচাপ শান্ত স্বভাবের সেই কিশোরী মেয়েটা নিজেও বোধহয় কল্পনা করেনি, এতটা প্রতিভা তার ভেতরে লুকিয়ে আছে! তিশা যদিও এটাকে প্রতিভা মানতে নারাজ, তার ভাষায়, যে কাজটা করতে তিনি পছন্দ করে, ভালোবাসেন, সেটাতে নিজেকে উজাড় করে দেন। আর সেই উজাড় করে দেয়ার ফলাফলই এটা। 

নুসরাত ইমরোজ তিশা

নতুন কুঁড়িতে চ্যাম্পিয়ন হবার দুই বছর পরে অনন্ত হীরার পরিচালনায় প্রথমবারের মতো টিভি নাটকে অভিনয় করলেন তিশা। তেরো পর্বের একটা ধারাবাহিক নাটক ছিল সেটা। প্রায় একই সময়ে আহসান হাবীবের ‘ফিরে দেখা’ নামের এক পর্বের নাটকেও দেখা গিয়েছিল তাকে। হুমায়ূন আহমেদের প্যাকেজ সংবাদ নাটকে কুবই ছোট্ট একটা চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাকে, এটা হয়তো অনেকে জানেনও না।

নাটকের জগতে একটা সময়ে নিয়মিত হয়ে উঠলেন তিশা। এর আগে কোকাকোলার বিজ্ঞাপন দিয়ে তিশার মায়াকাড়া চেহারাটা চিনে নিয়েছিলেন এদেশের টেলিভিশন দর্শকেরা। অরণ্য আনোয়ারের ‘নূরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল’ নাটকটা দিয়ে তাদের মনের ভেতরে নিজের আসনটাও পাকাপোক্ত করে ফেলেছিলেন এই অভিনেত্রী। আমার দেখা তিশার অভিনীত প্রথম নাটক সেটাই। 

তারপরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে চলার। একে একে এলো ক্যারম, ৬৯, ৪২০, গ্র্যাজুয়েট, ইট কাঠের খাঁচা, কফি হাউজ, মনফড়িঙের গল্প, আরমান ভাই, ভালোবাসি তাই, ভালোবাসি তাই ভালোবেসে যাই...তালিকাটা অনেক লম্বা। অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প সিরিজে একটা নাটক দেখেছিলাম, নাম ‘বুকের ভেতর কিছু পাথর থাকা ভালো’। নাটকে বলতে গেলে তিনি একাই ছিলেন, দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন, একজন মায়ের মমত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন অদ্ভুত সুন্দরভাবে। 

সিনেমাপাড়ায় তার আগমন মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর হাত ধরে, ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’ দিয়ে। এই সিনেমাটা যখন মুক্তি পেয়েছিল তখন আমার বয়স কম, ক্লাস টেনে পড়ি। ভালো অভিনয় খারাপ অভিনয় বোঝার বয়সটা হয়নি তখনও। আমি শুধু মুগ্ধ হয়ে তিশাকে দেখছিলাম পুরোটা সময়। এরপরে তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’ সিনেমায় ছোট একটা চরিত্রে কাজ করেছেন, ফারুকীর সিনেমাতেই বেশী কাজ করেছেন তিনি। ‘অস্তিত্ব’ আর ‘রানা পাগলার’ মতো কমার্শিয়াল সিনেমাতেও দেখা গেছে তাকে। তবে তিশার সেরা অভিনয়টা সম্ভবত ‘ডুব’-এ দেখেছে দর্শক। 

শনিবার বিকেল সিনেমায় তিশা

আমার কথা বলি, আমি সিনেমা হলে গিয়েছিলাম ইরফান খানকে দেখতে, হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজতে, আর বেরিয়ে এলাম তিশার প্রতি একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে, যে মুগ্ধতায় থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার দেখার পরে আক্রান্ত হয়েছিলাম,। কিংবা তারও বেশী হয়তো। সাবেরী চরিত্রটা তিশার চেয়ে ভালো করে কেউ করতে পারতো না। ইরফান খানের মতো মেথড অ্যাক্টরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি, প্রতিটা দৃশ্যে। বাবাকে পানির গ্লাস দেয়ার সেই দৃশ্যটায় চোখে জল যার জমেনি, আমার চোখে সে পাষাণ বৈকী! 

এরপর তৌকির আহমেদের ‘হালদা’তেও তিনি দারুণ সাবলীল ছিলেন, এরপর একই পরিচালকের 'ফাগুন হাওয়ায়'-তেও প্রশংসিত হয়েছে তার অভিনয়। ক্যারিয়ারে মোট চৌদ্দটা মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার আছে তার, সেরা অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারটাও পেয়েছেন দুবার।

ফারুকীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্রণয়ে জড়িয়েছেন, বিয়ের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক পেয়েছে পরিণতি। এই দম্পতির ঘর আলো করে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি এসেছে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান, ইলহাম নুসরাত ফারুকী। এখন নিশ্চয়ই জীবনের মানেটাই বদলে গিয়েছে তিশার! 

বাবাকে হারিয়েছেন প্রায় চৌদ্দ বছর আগে, তিশার ক্যারিয়ার তখন কেবল হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। তিশার সফলতার পুরোটা বাবা দেখে যেতে পারেননি, কিন্ত তার দৃঢ় বিশ্বাস, বাবা সবসময় তার পাশেই আছেন। তাকে দেখছেন, তার সাফল্যের ভাগীদার হচ্ছেন। মায়ের সঙ্গে তার দারুণ বন্ধুত্ব, তার জীবনের খুটিনাটি সবকিছুই মা জানেন। ফারুকী যখন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিশাকে, সেটাও সবার আগে মা’কেই এসে জানিয়েছিলেন তিশা। তার ক্যারিয়ারে মায়ের অবদানও অপরিসীম। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন নাটকের সেটে যেতেন এই ভদ্রমহিলা, ক্লান্তি তাকে গ্রাস করতে পারেনি কখনও। বাবা মায়েরা নিজেদের উজাড় করে দিলে সন্তানের সাফল্য অর্জনটা সহজ হয়ে যায় খানিকটা, তিশা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তিশার ভাষায়- ‘আমার বাবা আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন, আর মা সেগুলো পূরণ করতে কোমর বেঁধে নেমেছিলেন।’ 

নতুন কুঁড়ির মঞ্চ থেকে সিনেমার আলো ঝলমলে রঙিন দুনিয়া- যাত্রাপথটা খুব সহজ কিছু ছিল না। তাছাড়া তিশার অভিনয়ের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, তিনি মঞ্চে অভিনয় করেননি কখনও। কিন্ত স্রষ্টা তাকে প্রতিভার ভাণ্ডার দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, সেই প্রতিভাটাকে পরিশ্রমের কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে সাফল্যের হীরকখণ্ডে রূপান্তরিত করেছেন তিশা। বাংলা নাটকের জগতে এই মূহুর্তে তিনি অবিসংবাবিতভাবে সেরা অভিনেত্রী। ছোট পর্দাকে তিনি ছেড়ে যেতে চাননা কখনও, বড় পর্দায় কাজ করবেন, কিন্ত ছোট পর্দাকে বিদায় জানিয়ে নয়। টেলিভিশনের পর্দা তাকে পরিচিতি দিয়েছে, খ্যাতি দিয়েছে, সেই ‘পিতৃপরিচয়’টা তিনি ভুলতে চাননা কখনও। 

১৯৮৬ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন নুসরাত ইমরোজ তিশা নামের মেয়েটা, সেদিন হয়তো কেউ জানতো না, অভিনয়ের প্রতিভায় বাংলা টিভি নাটককে আলোকিত করবে এই মেয়ে। ছত্রিশে পা রাখা এই প্রিয় অভিনেত্রীকে ‘সিনেগল্প’ পরিবারের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা