তাহসান সৃজিতকে শ্রদ্ধা করেন, সৃজিত করেন তাহসানকে। তাহসান-মিথিলার মেয়ে আইরার সঙ্গেও সৃজিতের দারুণ সম্পর্ক, এদিকে বিচ্ছেদের পরে মিথিলাকে নিয়ে একটা সমালোচনাও শোনা যায়নি তাহসানের মুখে। অথচ অনলাইনে দুদিন পরপরই নোংরামির মচ্ছব বসায় 'নিখিল বঙ্গ মিথিলাবিরোধী পরিষদ'...

শিল্পী এবং অভিনেতা তাহসানের একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজারে। এটা সম্ভবত ভারতীয় মিডিয়ায় তাহসানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইন্টারভিউ। খুব মন দিয়ে সেই সাক্ষাৎকারটা পড়লাম, অবধারিতভাবেই সেখানে কাজের পাশাপাশি মিথিলার প্রসঙ্গ এসেছে, বরাবরের মতোই তাহসান খুব স্মার্টলি হ্যান্ডেল করেছেন প্রশ্নগুলো, তার দেয়া উত্তরের প্রতিটা শব্দে মিশে ছিল প্রাক্তনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান। 

মিথিলা এবং তাহসান আলাদা হয়েছেন প্রায় চার বছর হতে চললো, মিথিলার জীবনে নতুন মানুষ এসেছে, বিখ্যাত ভারতীয় পরিচালক সৃজিত মুখার্জীর সঙ্গে পরিণয়ে জড়িয়েছেন তিনি। বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটা বড় অংশ গত চার বছর ধরেই মিথিলাকে গালমন্দ করে চলেছে নিদ্রাহীনভাবে। এদের কার্যক্রম দেখলে মনে হয়, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর জন্য 'নিখিল বঙ্গ মিথিলাবিরোধী পরিষদ' খুলে বসেছে বুঝি এরা! এদের উৎপাতে একটা পর্যায়ে তো মিথিলা আইনের আশ্রয় নেয়ার কথাও ভেবেছিলেন। 

অথচ তাহসানকে দেখুন, মিথিলা কিংবা সৃজিত, দুজনের প্রতিই তার অগাধ শ্রদ্ধা, মেয়ে আইরাকে বাবার আদর বা মায়ের ভালোবাসা, কোনোটা থেকেই বঞ্চিত হতে হচ্ছে না। এমনকি সৃজিতও আইরাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন, তাহসান আবার কাজ করতে চান সৃজিতের সিনেমায়- অনলাইনের হাজারটা বুলিং আর নোংরামির মচ্ছবের মধ্যে তাহসান-মিথিলা-সৃজিতের এমন আচরণ, সবকিছুকে এত স্বাভাবিকভাবে নিতে দেখে মনে হয়, হুট করে কোন ইউটোপিয়ায় ঢুকে পড়লাম বুঝি! 

তাহসান-মিথিলা- যখন স্বামী-স্ত্রী ছিলেন

আনন্দবাজারের তরফ থেকে তাহসানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মিথিলার সঙ্গে বন্ধুত্বটা কী ভাবে বজায় রেখেছেন? তাহসানের জবাবটা হয়েছে বাঁধিয়ে রাখার মতো, তিনি বলেছেন- "আমাদের প্রত্যেকেরই তো কিছু দোষ-গুণ আছে। আমাদের একটা সম্পর্ক ফেল করেছে মানে এই নয় যে বন্ধুত্ব থাকবে না। আমাদের মেয়েকে আমরা দু’জনেই খুব ভালবাসি। আমার মেয়ের মায়ের নামে তাই একটি শব্দও খারাপ বলব না। আমি মনে করি, আমরা দু’জন আলাদা থেকেও আয়রাকে সুন্দর ভাবে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারি। এ ছাড়াও বিচ্ছেদের তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তখন আমার জীবনের কঠিন সময় ছিল। কিন্তু আমরা কেউই বাইরের মানুষের কথায় আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করিনি। তাই বোধ হয় আমাদের সম্পর্কটা এতটা সহজ।"

আমাদের মধ্যে খুব স্টেরিওটিপিক্যাল এবং বিচ্ছিরি একটা ধারণা আছে, সম্পর্ক শেষ মানেই অপরপ্রান্তের মানুষটাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করতে হবে, তার ঘাড়ে সব দোষ চাপাতে হবে, তাকে ছোট করে কথা বলতে হবে, জনসমর্থনটা নিজের দিকে নিয়ে আসতে হবে। গত তিন বছরে তাহসানকে কেউ এমনটা করতে দেখেনি। বরং মিথিলা যখন অনলাইনে নোংরামির শিকার হয়েছেন, তখন তাহসান তার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এর আগেও তিনি একটা ইন্টারভিউতে বলেছেন, তার মেয়ের মা'কে নিয়ে কোন নোংরামি করা হলে, বাজে কথা বলা হলে তিনি সেটা সহ্য করবেন না। 

আপনি সৃজিত মুখার্জীর ফেসবুক প্রোফাইলে যান। আইরার সাথে সেখানে সৃজিতের ভুরি ভুরি ছবি পাবেন, বন্ধুর মতো মিশছেন দুজন। মায়ের নতুন সঙ্গী আইরাকে খুব দ্রুতই আপন করে নিতে পেরেছেন। বাংলাদেশে যখন সৃজিত এসেছেন, তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তাহসানের ব্যাপারে। সৃজিত ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তাহসানের, তাহসানকে 'অসম্ভব ভালো মানুষ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন বারবার। সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথিলা যখন আইরার ছবি আপলোড দিচ্ছেন, সেখানে তাহসান কমেন্ট করছেন, মেয়ের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মিথিলার সঙ্গে খুনসুটি করছেন তিনি। 

আইরার সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক সৃজিতের

গোটা ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়ালো বলুন তো? তাহসান সৃজিতকে শ্রদ্ধা করেন, সৃজিত করেন তাহসানকে। বিচ্ছেদের পরেও তাহসান-মিথিলার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় আছে। হ্যাঁ, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তারা সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে পারেননি, মতের অমিল হয়েছে, দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, দুজনে সিদ্ধান্ত নিয়ে আলাদা হয়েছেন, তিক্ততা বাড়াতে চাননি, ব্যক্তি আক্রমণে না মেতে সৌজন্য সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটার জন্যেই তাদের মেয়েটা ব্রোকেন ফ্যামিলির সদস্য হিসেবে বড় না হয়ে বরং বাবা-মা দুজনেরই ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বেড়ে উঠছে। 

কিন্ত এই ব্যাপারটাই পছন্দ হয় না এদেশের কিছু মানুষের। ব্যক্তিজীবন নিয়ে, সম্পর্ক নিয়ে আজীবন ফ্রাস্টেশনে ভোগা কিছু মানুষ থাকেন, অন্যকে ভালো থাকতে দেখলে যাদের গায়ে জ্বালা করে। তারা অযথা নোংরামিতে মত্ত হন, সম্পর্ক থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে, দূরে থেকেও যে পরস্পরকে শ্রদ্ধা করা যায়, সম্মান দেখানো যায়- এই জিনিসটা তারা মানতেই চান না। সেজন্য তারা মিথিলার ফেসবুক পেইজে গিয়ে গালিগালাজ করে, সৃজিতের পেইজে কটুমন্তব্য করে, তাহসানের পোস্টের কমেন্টে রেখে আসে মিথিলা এবং সৃজিতের ছবি। শিল্পী অনুপম রায় নিজের পোস্টের কমেন্ট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন এদের অত্যাচারে। গোটা বিষয়টা যে কী পরিমাণ লজ্জার, সেটা এদের বোধগম্য হয় না, সম্ভবত হবেও না কখনও। 

এই যে চোখের সামনে শ্রদ্ধা, সম্মান আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার এতগুলো টাটকা উদাহরণ, সেগুলো দেখেও আমাদের নোংরা মনে তৃপ্তি আসে না, থামতে ইচ্ছে হয় না আমাদের। পাপের পঙ্কিলতায় গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা আমরা তবুও বাজে মন্তব্য করে যাই, নিজেদের চরিত্রের ঠিক না থাকা আমরাই অন্যের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলি! একজন মানুষ একটা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে গিয়ে আরেকটা সম্পর্কে জড়াতেই পারেন- এই স্বাভাবিক জিনিসটা কেন কিছু মানুষ সহ্য করতে পারেন না- এই রহস্যের সমাধান সম্ভবত মিসির আলীও করতে পারবেন না কখনও! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা