বাংলাদেশের কোনো থ্রিলার ফিল্মে সাসপেক্ট এর ম্যানারিজম নিয়ে ডিটেইলড রিসার্চ, পিনোকিও টেস্ট কিংবা ব্লাইন্ড স্পট নিয়ে কথা শুনবো, তা মোটেও আশা করিনি। এবং যেভাবে প্রসঙ্গগুলোকে আনা হয়েছে এবং জুড়ে দেয়া হয়েছে গল্পের সাথে, সেটাও যে এমন চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যাবে, আশা ছিলো না সেটিও। কিন্তু সেটিই হয়েছে। 'রেডরাম' দেখে তাই মুগ্ধতা বেড়েছে। তৃপ্তির ঢেঁকুরও হয়েছে সশব্দ!

স্টিফেন কিং এর বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য শাইনিং' এ প্রথমবার উচ্চারিত হয়েছিলো বিশেষ এক শব্দ- Redrum. যার অক্ষরগুলোকে উলটো দিক থেকে পরপর সাজালে তৈরী হয়- Murder. যে মার্ডার নিয়ে পরবর্তীতে এক গল্প ফাঁদা হলো। এবং সে গল্প ফাঁদলেন এমন একজন, যিনি থ্রিলার গল্প এবং গল্পশেষে টুইস্ট দেয়ার জন্যে বরাবরই বেশ বিখ্যাত৷ হ্যাঁ, ভিকি জাহেদের কথাই হচ্ছে। বাংলাদেশে যে কয়জন নির্মাতার থ্রিলার গল্পের উপর ভরসা করা যায়, এবং যারা গল্পকে শুরু থেকে শেষতক দারুণ এক মোমেন্টামের মধ্যে রাখতে পারেন, সে নির্মাতাদের তালিকায়ও অবলীলায় রাখা যায় ভিকি জাহেদকে।

ভিকি জাহেদের 'রেডরাম' নিয়ে তাই বিস্তর প্রত্যাশাই ছিলো। 'পুনর্জন্ম' সিরিজের চমক এবং সাফল্যও পার হয়নি বেশিদিন। এরইমধ্যে আরেক নির্মাণ। প্রত্যাশার পাশাপাশি খানিকটা শঙ্কাও যে ছিলো না, তাও না। অল্পসময়ের ব্যবধানে একের পর এক কাজ। একঘেঁয়ে চর্বিত চর্বণ হবে কি না, তা নিয়েও বিস্তর 'যদি-কিন্তু' ছিলো। কিন্তু 'রেডরাম' এর শুরুতেই 'আফরান নিশো' যখন 'শেফ রাফসান' থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবয়বের 'সিআইডি অফিসার রাশেদ চৌধুরী' হিসেবে এসে মুহুর্তের মধ্যে একটি চাঞ্চল্যকর কেসের জলবৎ-তরলং মীমাংসা করে দিলেন, তাও সাসপেক্টের ঈষৎ অঙ্গভঙ্গি লক্ষ্য করে, বোঝা গেলো- ভিকি জাহেদ 'চরকি'র জন্য বেশ গবেষণা করে, আঁটসাঁট বেঁধে, আদাজল খেয়েই নেমেছেন ময়দানে। 

গল্প এগোচ্ছে। সিআইডির চৌকস অফিসার, যাকে 'হিউম্যান লাই ডিটেক্টর' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, সেই রাশেদের 'বেস্ট ফ্রেন্ড' জনপ্রিয় শিল্পী সোহেলকে বেডরুমে গলা কেটে খুন করে কেউ একজন৷ স্বাভাবিকভাবেই, বন্ধুর হত্যা-রহস্য উন্মোচনে নেমে পড়ে রাশেদ। সম্ভাব্য খুনীর তালিকাও বেশ লম্বাচওড়া। সোহেলের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, বাবা, সৎ মা, সৎ ভাই, শ্বশুর সহ অনেকেই। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা ধরে রাশেদ এই খুনের যতই গভীর শাখাপ্রশাখায় প্রবেশ করতে শুরু করে, ততই জটিল হয় সমীকরণ। পাশাপাশি যুক্ত হয় মিডিয়া ট্রায়াল, ফ্ল্যাশব্যাকে কলেজজীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতি। এভাবেই এগোতে এগোতে আচমকা যখন ক্লাইমেক্স আসে, তখনই চমক। ভিকি জাহেদ শেষটা করেন নিজস্ব স্টাইলেই। বড়সড় এক চমক আর সবগুলো পাজলকে একত্রে মিলিয়ে চমৎকারভাবে। 

'রেডরাম' এর ক্যামেরার কাজও হয়েছে চমৎকার! 

যদি গল্পের কথা বলা হয়- 'রেডরাম' এর গল্প খুব যে 'আউট অফ বক্স' ঘরানার কিছু, মোটেও এরকম না। 'হু ডিড ইট' স্টাইলে শুরু হওয়া এই থ্রিলার বেশ ছিমছাম গল্প নিয়েই এগিয়েছে। তবে গল্প যেমনই হোক, নির্মাতা ভিকি জাহেদ বরাবরের মতই চমৎকারিত্ব দেখিয়েছেন গল্প-বয়ানে। শুরু থেকে জমাটি এক সাসপেন্স গল্প, টানটান স্ক্রিনপ্লে, বিদ্রোহী দীপনের ক্যামেরার কাজ, পুরো গল্পজুড়েই সিনেম্যাটিক কিছু আবহ, পিয়ানো-মাউথ অর্গান কিংবা সাসপেন্সের বিজিএম ... সব মিলেমিশে গল্প-বর্ণনায় এবারেও পাশমার্ক। পাশাপাশি, গল্পের ন্যারেশনে যে ভয়েসওভার, যেটা ভিকি জাহেদের নির্মাণের ট্রেডমার্ক, সেটা সব নির্মাণে খুব একটা ভালো না লাগলেও, রেডরামের ক্ষেত্রে এই ভয়েসওভারও বেশ ভালোভাবেই হলো প্রাসঙ্গিক।

'রেডরাম' এর তুরুপের তাস অবশ্যই আফরান নিশো। তাকে নিয়ে চাইলে অনেক কথাই বলা যাবে। এই নির্মাণে তার চরিত্রে যে পরিমিতিবোধ ছিলো, কলেজের 'রাশেদ' এবং সিআইডি অফিসার 'রাশেদ' এর ক্যারেক্টার টোনে যে পার্থক্য ছিলো, তার পুরোটুকুই বেশ দুর্দান্তভাবেই তিনি নিয়ে এসেছেন তার অভিনয়ে। বেশ সাবলীল অভিনয়ই করেছেন। তবে, ওপ্রান্তের আরেক প্রোটাগনিস্ট মেহজাবিনের কাছ থেকে প্রত্যাশা আরেকটু বেশিই ছিলো। যতটুকু তিনি করেছেন, তা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক ও দারুণ। কিন্তু তিনি এর চেয়েও ভালো অভিনয় করেন, তাই খানিকটা খেদ রয়েই গিয়েছে।

আফরান নিশো বরাবরের মতই অনবদ্য! 

প্রোটাগনিস্ট নিশো আর মেহজাবিনের পাশাপাশি মনোজ প্রামাণিক এর উপস্থিতিও ছিলো চমকপ্রদ। সালহা খানম নাদিয়াও যথাযথ৷ যে ক'টি দৃশ্যে ছিলেন, সহ-কুশীলবদের সাথে সমানতালেই অভিনয় করে গিয়েছেন৷ অনেকদিন পরে আজিজুল হাকিমের স্বল্পদৈর্ঘ্যের কিন্তু যথাযথ অভিনয় দেখে ভালো লেগেছে। বলতে হবে নাসিরউদ্দিন খান এর কথাও। তিনি তো বরাবরই অনবদ্য। এখানেও দারুণ। তবে এদের বাইরে বাদবাকি যারা, তাদের অভিনয় খুব একটা ভালো লাগেনি। কারো কারো অভিনয় একটু বেশিই বাড়াবাড়ি। তবে এরা ধর্তব্য নয়। তাই, উপেক্ষাই সমীচীন। 

বাংলাদেশের কোনো থ্রিলার ফিল্মে সাসপেক্ট এর ম্যানারিজম নিয়ে ডিটেইলড রিসার্চ, পিনোকিও টেস্ট কিংবা ব্লাইন্ড স্পট নিয়ে কথা শুনবো... তা মোটেও আশা করিনি। এবং যেভাবে প্রসঙ্গগুলোকে আনা হয়েছে এবং জোড়া হয়েছে গল্পের সাথে, সেটাও যে এমন চমৎকারভাবে খাপ খেয়ে যাবে, আশা ছিলো না সেটিও। কিন্তু সেটিই হয়েছে। যদিও ক্লাইমেক্সের কিছু অংশ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে, তবুও সেটুকু বাদ দিয়ে বাকিটুকু যেন বাংলাদেশের 'থ্রিলার নির্মাণ' এর উন্নতির গ্রাফটিকেই স্পষ্টভাবে দেখালো। বেশ ইতিবাচক হিসেবেই ভালো লাগলো বিষয়টি।

অনবদ্য অভিনয় করেছেন মনোজ প্রামাণিক! 

ভিকি জাহেদের 'রেডরাম' নিয়ে যতটুকু প্রত্যাশা ছিলো, তার পুরোটুকুই পূরণ হয়েছে। তৃপ্তির সশব্দ ঢেঁকুরও হয়েছে পাথেয়। ঠিক সে কারণেই তাই দ্ব্যর্থকন্ঠে বলতে হচ্ছে- ছিমছাম গল্প আর দুর্দান্ত ন্যারেশনে গল্প বলার যে সৌন্দর্য, তা ভিকি জাহেদকে দেখে বাকিরা শিখুক,  গৎবাঁধা কাজের বদলে মানসম্মত কাজ আসুক, এদেশের সংস্কৃতিক্ষেত্রের দৈন্যদশা কাটুক। তাহলেই কল্যান। সর্বতোমঙ্গল। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা