শেষ কবে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে এরকম বড় পরিসরে কাজ করতে দেখেছেন উপমহাদেশে? আমাদের পরবর্তী জেনারেশনকে যদি সত্যজিৎকে চেনাতে হয়, সরি টু সে প্রথমেই তাদের সত্যজিৎ গেলানো যাবে না...

সত্যজিৎ রায়কে ট্রিবিউট দিতে হলে কেন সত্যজিৎ রায় লেভেলের কাজ দেখাতে হবে? এই এন্থলজি সিরিজের রিভিউ একটু পরে করছি। প্রথমে একটু এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজি। শেষ কবে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে এরকম বড় পরিসরে কাজ করতে দেখেছেন উপমহাদেশে? হ্যাঁ, অনেক ডিরেক্টর নিজেদের কাজের মধ্যে নানাভাবে সত্যজিতকে নিয়ে আসেন সত্যি কিন্তু সেটা তো এরকম আড়ম্বর করে না। আমাদের পরবর্তী জেনারেশনকে যদি সত্যজিৎকে চেনাতে হয় সরি টু সে প্রথমেই তাদের সত্যজিৎ গেলানো যাবে না। 

হ্যাঁ, সত্যজিতের কাজ প্রাসঙ্গিক ছিল, আছে, থাকবেও। কিন্তু এখনকার অনেক তরুণ দর্শক সত্যজিতকে পাঠ করতে গেলে, দেখতে গেলে হয়তো পুরোপুরি ধারন করতে পারবে না। এজন্য তাদের 'গ্রীক মিথ' ট্রিটমেন্টে ধরতে হবে। এটা আমার নিজস্ব দেয়া টার্ম। আমি গ্রীক মিথ সম্পর্কে কম জানি। কিন্তু হারকিউলিস, পার্সি জ্যাকসন, টাইটানস সিরিজ দেখে-পড়ে আমি অন্তত জিউস, পসাইডন, মেডুসা এদের অরিজিন স্টোরি ও ক্যারেক্টারিস্টিকস সম্পর্কে জেনেছি। এরপর আগ্রহ হওয়ায় আরও বেশি পড়াশোনা করেছি গ্রীক পুরাণ নিয়ে। ওরা মিথকে এভাবে ধারন করেছে, আধুনিক করেছে যে এখনকার জেনারেশনের টিনেজ ছেলেমেয়েরাও আকৃষ্ট হবে সেসব গল্প জানতে। 

আমাদেরও প্রয়োজনীয় সব মানুষ, গল্প, ইতিহাস চেনাতে হলে এই ট্রিটমেন্ট ইউজ করার বিকল্প নেই। নেটফ্লিক্সের 'রায়' এন্থলজি সিরিজ সেরকমই একটা প্রচেষ্টা মনে হয়েছে আমার। আমি সত্যজিৎ ফ্যানাটিক হয়ে খুঁজতে চাই নি যে নাহ সত্যজিৎ লেভেলের কিছু পাবো। আমি চেয়েছি গল্পগুলোর আধুনিক চিত্রায়ন। চেয়েছি এখনকার জগতে এই গল্পগুলোকে নতুন করে দেখতে। সেদিক থেকে আমি বেশ খুশি। আমাকে পরিতৃপ্ত করতে পেরেছে 'রায়'।

পরিতৃপ্ত করতে পেরেছে 'রায়'

ইংরেজিতে সত্যজিৎ রায়কে সত্যজিৎ রে উচ্চারণ করে। তাই সিরিজের নামের উচ্চারণ যদিও ইংরেজি হিসাবমতে 'রে' হবে, আমি বাংলা রায়ই ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। রায় সিরিজে সত্যজিতের মোট ৪ টি গল্প নিয়ে ৪ টি পর্ব তৈরি করা হয়েছে। যার মাঝে 'ফরগেট মি নট' ও 'বহুরূপীয়া' পরিচালনা করেছেন সৃজিত মূখার্জী, 'হাঙ্গামা হ্যায় কিউ বড়পা' পরিচালনা করেছেন অভিষেক চৌবে ও 'স্পটলাইট' পরিচালনা করেছেন ভাসান বালা। তিনজন পরিচালকেরই যোগ্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। অনেক প্রিয় প্রিয় সিনেমার নির্মাতা তারা। আমার কাছে মনে হয়েছে নিজেদের কম্ফোর্ট জোনের বাইরে যাবার চেষ্টা করেছেন তিনজনই টেকনিক্যাল দিক দিয়ে হোক কিংবা গল্পের দিক দিয়ে।

ফরগেট মি নট

আমার কাছে এই সিরিজের বেস্ট এপিসোড। অথচ ট্রেইলার দেখার সময় এটা নিয়েই সবচেয়ে কম আশা ছিল। আলি ফজল ভালো অভিনেতা, সৃজিত মূখার্জী ভালো পরিচালক। তবুও কে কে মেনন, মনোজদের ভিড়ে কীভাবে আশা করা যায় এই গল্প সবাইকে ছাপিয়ে যাবে। এই পর্ব ভালো লেগেছে তাঁর প্রধান কারণ এর ডিরেকশন। গল্পটা দারুণ ছিল কিন্তু সৃজিতের ডিরেকশন আমার অনবদ্য লেগেছে। 

শুরুতেই হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা নিয়ে ওয়ানশটে হুক করে ফেলেছিল। আলী ফজলও শুরুতেই গল্পে হুক করে ফেললেন আরও। এরপর গল্প যত এগিয়েছে ততই বেটার হয়েছে ডিরেকশন। ক্যারেক্টারাইজেশন হোক, সত্যজিৎকে বিভিন্ন ইস্টার এগ দিয়ে ট্রিবিউট দেয়া হোক, অথবা হোক শেষ ৫ মিনিটের অনবদ্য মনোলগ আর টেকনিক্যাল ব্রিলিয়ান্স; ফরগেট মি নট মুগ্ধ করেছে দারুণভাবে।

বহুরূপীয়া

কে কে মেনন, মেকআপ আর্টিস্ট। ট্রেইলারে এটুকু দেখেই দারুণ আকর্ষণীয় লাগছিল। গল্পের শুরুও দারুণ। জমছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু হুট করে খাপছাড়া হয়ে গেল। হুট করে মনে হল যে গল্প বলতে চেয়েছিলেন সৃজিত সেটা বলার জন্য তৈরি নন। কে কে মেননকেও মনে হল সামলাতে পারছেন না তিনি। আর এসব কাজে প্রস্থেটিকের কাজ প্রচুর, গল্পের মূল টুলই প্রস্থেটিক আর সেখানেই বারবার মার খেয়ে যায়। প্রায় একই ধাঁচের গল্প নিয়ে এই সৃজিতই আগে ভিঞ্চিদা বানিয়ে ফেলেছেন। তাই হয়তো আরও বেশি আশাভঙ্গ হয়েছে।

হাঙ্গামা হ্যায় কিউ বড়পা

এই সিরিজের সেকেন্ড বেস্ট এপিসোড আমার কাছে। অভিষেক চৌবে ইন্ডিয়ার ওয়ান অফ দ্য বেস্ট ডিরেক্টর। তাঁর ডিরেকশনে মনোজ বাজপেয়ী আর গজরাজ রাওকে দেখা ট্রিট ফর আইজ। দুজনই সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করেছেন, টক্কর দিয়ে অভিনয় করেছেন। সাথে রঘুবীর যাদব আর মনোজ পাহওয়ার ক্যামিও দারুণ লেগেছে। ম্যাজিক রিয়ালজমের ছায়া ছিল গল্পে, অভিষেক প্রেজেন্টও করেছেন সেটা দারুণভাবে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে ডায়লগ। উফফফ... উর্দুতে যা ডায়লগবাজি হল। কানে মধুবর্ষণ হল যেন।

হাঙ্গামা হ্যায় কিউ বড়পা গল্পে মনোজ বাজপায়ী

স্পটলাইট

খুবই আনইউজুয়াল গল্প। প্রথমে ভাবছিলাম ভালো লাগবে না হয়তো। যদিও হর্ষবর্ধনকে আমি বেশ পছন্দ করি। কিন্তু গল্প এগুতে থাকলে ভালোই লাগতে থাকে। বিশেষ করে শেষে গিয়ে ভালোই মজা পেয়েছি।  এই এন্থলজি সিরিজের প্রতিটা গল্পেই আছে অহম, হিংসা, প্রতিশোধ, ক্ষমা, দ্বন্দ্ব। মানবিক এই বিভিন্ন আবেগ, অনুভূতিকে কীভাবে যে সত্যজিৎ গল্পে নিয়ে আসতেন তা আজ অব্দি ভাবলে অবাক লাগে। 

সত্যজিতের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এমন ট্রিবিউট সত্যিই ভালো লেগেছে। শুধু একটা কাজ না, এরকম আরও অনেক কাজ হওয়া দরকার ছিল এই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে। তাহলেই না জেনারেশন টু জেনারেশন পাস হবে সত্যজিতের লেগ্যাসি। সময় বদলাক, আরও একশ বছর যাক, তবুও বদলাবে না মানুষের এসব সীমাবদ্ধতা। গল্পগুলোও থাকবে এমন বাস্তব সবসময়, অমলিন।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা