পরীমনির ক্যারিয়ারের সেরা কাজ এতদিন পর্যন্ত ছিল স্বপ্নজাল, একটা অন্যরকম বেঞ্চমার্ক সেট হয়ে গেছে শুভ্রা চরিত্রের মাধ্যমে। স্ফুলিঙ্গ'র দিবা সেই বেঞ্চমার্কটাকে ছুঁতে পারলো কি? শুভ্রাকে কি ছাপিয়ে যেতে পারলো দিবা?

বছর তিনেক আগে পরীমনি যখন গিয়াসউদ্দিন সেলিমের স্বপ্নজালে অভিনয় করলেন, সিনেমা হলে বসে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ঘন্টাদুয়েকের জন্য। স্বপ্নজাল মুক্তির সময়ও পরিমনীকে ইন্ডাস্ট্রিতে নবীন নায়িকাই বলা চলে। বেশ কিছু সিনেমা মুক্তি পেয়েছে তার, এরচেয়ে বেশি এসেছে সিনেমার ঘোষণা; কিন্ত সাড়া ফেলতে পারেননি খুব একটা। ডানাকাটা পরী আইটেম গানে জনপ্রিয়তা এসেছিল, কিন্ত রূপের সঙ্গে গুণের মিশ্রণটার খোঁজ পায়নি দর্শক, কোন নির্মাতাও গ্ল্যামারায়া নায়িকা পরীমনির বাইরে গিয়ে অভিনেত্রী পরীমনিকে খোঁজার চেষ্টা করেননি। 

গিয়াসউদ্দিন সেলিম স্বপ্নজালে সেই চেষ্টাটা করলেন, এবং চমকে দিলেন সবাইকে। তিনি নিজেও খানিকটা অবাক হননি ডানাকাটা পরী থেকে শুভ্রা চরিত্রে পরীমনির এই দুর্দান্ত ট্রান্সফর্মেশনে। একদম শুরু থেকেই প্রানবন্ত পরীমনি। গ্ল্যামার ছুঁড়ে ফেলে অদ্ভুত সাবলীল অভিনয় তার। সেই চেনা ইমেজ ভেঙে শুভ্রায় ঢুকে যাওয়া, পাশের বাড়ির মেয়ে হয়ে ওঠা। পুরো সিনেমাতে বেশ কয়েকবার রূপ বদলেছেন, কখনও তিনি প্রতিবাদী, কখনও বিদ্রোহী, কখনও ভালোবাসার কাঙাল, আবার কখনওবা আদরে গলে যাওয়া প্রেমিকা। 'তুমি আমার'- দুই অক্ষরের সংলাপে জেদি শুভ্রা বুঝিয়ে দিচ্ছেন ভালোবাসার অধিকারের কথা, আবার গুরুদেবের সামনে ভিন্নধর্মের ভালোবাসার মানুষটার কথাও বুক চিতিয়ে জানাচ্ছেন তিনি।

এই শক্ত মেয়েটাই আবার কখনও ভেঙে পড়ছে, কখনও মাসীর হাতে মার খাওয়া ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরছেন সস্নেহে, ভালোবাসার তীব্রতা প্রতিটা দৃশ্যে আলাদা আলাদাভাবে প্রকাশ করছেন- এমন কিছু পরীমনির কাছে প্রত্যাশিত ছিল না মোটেও। ‘রক্ত’ সিনেমার মারদাঙ্গা পরী, কিংবা ‘ডানাকাটা পরী’ গানের আবেদনময়ী পরী; অথবা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের নিউজফিড জুড়ে উষ্ণতা ছড়াতে থাকা গ্ল্যামারাস সেই নায়িকা- পরীমনির পরিচয় সবার কাছে ছিল এটাই। স্বপ্নজাল দিয়ে নতুন একটা পরিচয় তৈরী করেছেন পরী, তিনি স্বপ্নজালের শুভ্রা, চরিত্রের গভীরে ডুব দেয়া একজন নিবেদিতপ্রাণ অভিনেত্রী! 

পরীমনি যখন শুভ্রা

এরপর অনেকটা সময় কেটে গেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে অজস্রবার। পরীমনির ভেতর থেকে 'অভিনেত্রী'র খোঁজটা বের করার তাগাদা আর অনুভব করেননি কেউ। এরপর ওয়েবফিল্ম 'প্রীতি'-তে অভিনয় করেছেন, 'বিশ্বসুন্দরী' চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, মোটামুটি ভালো করেছেন সবখানেই। কিন্তু স্বপ্নজালের অমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরেও পরীকে ঠিকভাবে এক্সপ্লোর করতে না পারাটা অপরাধের পর্যায়েই পড়ে।

২০২০ সালের শেষ প্রান্তে সেই কাজে হাত দিলেন তৌকীর আহমেদ। গুণী ওই নির্মাতা নিজের সপ্তম সিনেমা স্ফুলিঙ্গর কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিলেন পরীমনিকে। তার চরিত্রের নাম দিবা। আরও একবার 'দ্য গার্ল নেক্সট ডোর' হয়ে পর্দায় হাজির হলেন পরী। কিন্তু সিনেমাটার ভাগ্য বড় খারাপ। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের একদম গোড়ায় মুক্তি পেয়েছিল স্ফুলিঙ্গ, সিনেমা মুক্তির কয়েকদিন পরেই শুরু হলো লকডাউন, সিনেমা হল হলো বন্ধ। এই সিনেমাটা হলে বসে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সম্প্রতি এই সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফিতে। বিনামূল্যে দর্শকেরা উপভোগ করতে পারছে সিনেমাটি। তাই মনে হলো, স্ফুলিঙ্গে পরীমনির পারফরম্যান্স নিয়ে এখন বোধহয় কথা বলা যায়।

পরীমনিকে নিয়ে লিখতে গেলে বারবার স্বপ্নজালের কথা আসবেই, কারণ পরীর ক্যারিয়ারের সেরা কাজ এটি, একটা অন্যরকম বেঞ্চমার্ক সেট হয়ে গেছে শুভ্রা চরিত্রের মাধ্যমে। স্ফুলিঙ্গ'র দিবা সেই বেঞ্চমার্কটাকে পেরিয়ে যেতে পেরেছে, এমন দাবী করব না। কিন্তু স্ফুলিঙ্গ দেখার পর আর কিছু মনে রাখতে না চাইলেও, দিবাকে মনে থাকবে। তার অভিমান, তার জেদ, প্রেমিকের পাশে থাকার জন্য তার প্রাণান্ত চেষ্টা- সবকিছুই যেন মাথায় গেঁথে থাকে। স্ফুলিঙ্গে মায়াবী স্নিগ্ধতা ছড়ানো পরীমনিতে মুগ্ধ হওয়াটাই যেন নিয়তি। 

টফি অ্যাপে স্ফুলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে বিনামূল্যে

ভালো পরিচালকের সাথে কাজ করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন পরীমনি। তৌকীর আহমেদ যখন তাকে স্ফুলিঙ্গের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন গল্প না শুনে, পারিশ্রমিকের কথা না ভেবেই রাজী হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরিমনি জাত অভিনেত্রী নন, অভিনয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই তার, কাজ করতে করতে শিখছেন। কিন্ত ভালো কিছু করার, ক্যারিয়ারে বলার মতো কয়েকটা কাজ যোগ করার অদম্য একটা বাসনা আছে তার মধ্যে। রূপসর্বস্ব নায়িকা হয়ে পর্দায় শোভা বাড়াতে তিনি চান না, বরং চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে গল্পে অবদান রাখতে চান, চান সিনেমার কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। নায়িকা আর অভিনেত্রীর মধ্যে পার্থক্য তো এখানেই!

তৌকীর আহমেদ বরাবরই খুব দ্রুত তার সিনেমার শুটিং শেষ করেন। স্ফুলিঙ্গের শুটিং শেষ হয়েছে মাত্র ২৩ দিনে। যে কোন অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্য ব্যাপারটা একটু চ্যালেঞ্জিং। করোনা পরিস্থিতির মাঝেই বাকিদের মতো পরীমনিও সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, উতরেও এসেছেন তাতে। স্বপ্নজালে পরীমনি নিজেকে ডিরেক্টর'স আর্টিস্ট হিসেবে প্রমাণ করেছিলেন, দেখিয়েছিলেন, পরিচালক জহুরি হলে তার ভেতর থেকে অভিনয় নামের হীরকখণ্ডটা বের করে আনা যায়। সেই কাজটা তৌকীর আহমেদও ভালোভাবে করতে পেরেছেন। আর তাই স্বপ্নজালের পর পরীমনির ক্যারিয়ারগ্রাফে বলার মতো আরও একটা পারফরম্যান্স যোগ হলো, নাম তার স্ফুলিঙ্গ। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা