যারাই এই ওয়েব সিরিজ দেখতে বসবেন, তাদের এটুকু মাথায় নিয়ে বসতে হবে, নতুনত্বের কোনো সন্ধান 'নিখোঁজ' দেবে না। গল্পশেষে চমকেরও সেরকম কোনো ক্ষেত্র নেই। কিন্তু, যা আছে, তাও অবহেলা করার নয় মোটেও। এখান থেকে যা প্রাপ্তি, তা হয়তো গভীরে সেভাবে দাগ কাটবেনা, কিন্তু ভাবাবে বিস্তর। 'নিখোঁজ' এর উৎকর্ষতা সেখানেই...

জাপানের প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী বলা হয়, একজন মানুষের তিনটি মুখোশ থাকে। একটা মুখোশ রাখে সে বাইরের জন্যে। আরেকটা মুখোশ পরিবারের জন্যে। তৃতীয় মুখোশ একান্ত ব্যক্তিগত। সে মুখোশটি শুধু নিজের জন্যে। অর্থাৎ, মানে দাঁড়াচ্ছে এই, মানুষ এমনই এক প্রাণী, যে নিজের মুখোমুখি নিজেও দাঁড়ায় না কখনো। সেজন্যেই সে আগলে রাখে তৃতীয় মুখোশ কিংবা ব্যক্তিগত মুখোশ। 

সুতরাং, প্রমাণিত এটাই, মানুষ বিচিত্র। জটিল তার মন। এবং এই জটিল মন ধারণ করে থাকা মনুষ্যজাতি ক্ষেত্রবিশেষে উপন্যাস-সদৃশও। উপন্যাসে যেমন দীর্ঘ কলেবরে নানা অবতারের বসবাস, নানা ঘটনার মিলিত দীর্ঘশ্বাস, মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। এক জীবনে যে কত জীবন, কত রকম পরিণতি মানুষের... তা ভাবতে বসলে বেগ পেতে হয়ই৷ এবং, এসব সাপেক্ষে, শেষবেলায় আপ্তবাক্য এটুকুই টিকে থাকে, মানুষ জটিল। জটিলতাই তার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। চরমতম হাতিয়ার। 

চরকি'র সাম্প্রতিকতম ওয়েব সিরিজ 'নিখোঁজ' এর প্রেক্ষাপটজুড়ে এরকমই কিছু জটিল মানুষের গল্প। যাদের মধ্যে কেউ হয়তো শিকার৷ কেউ শিকারী। কেউ সাদা। কেউ কালো। আবার কেউ কেউ সাদা-কালো উপেক্ষা করে বিস্তর ধূসর। এই যে বিচিত্র সব মানুষ, যারা বর্ণময়, তাদের আছে নিজস্ব গণ্ডি। পরিবেশ-প্রতিবেশ। সেখানে আছে সংকট। যে সংকটের ফলশ্রুতিতে ক্রমশ পালটায় মুখোশ। বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ। খানিকটা বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে? যদি উত্তর হয় 'হ্যাঁ', তাহলে জানাই, এই বিভ্রান্তির গল্পই 'নিখোঁজ।' 

'নিখোঁজ' এর গল্প খানিকটা সাদামাটা, আবার খানিকটা বেশ অন্যরকম। ওয়েব সিরিজের প্রথমেই যেমন জানা যায়- ফারুক আহমেদ নামের এক মধ্যবয়স্ক ব্যাংকার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার পরপরই তার পরিবারের সদস্যরা নেমেছে এই 'অন্তর্ধান রহস্য' উন্মোচনের কাজে। গল্পের এটুকু বেশ সোজাসাপটা। নতুনত্ব খুব একটা নেই৷ একজন মানুষ আচমকা হারিয়ে গেলে সেই মানুষকে খোঁজার জন্যে আত্মীয়স্বজনের যে সংগ্রাম... এ গল্প আমাদের বেশ পরিচিত। এরকম গল্পের নির্মাণও আশেপাশে কম নেই মোটেও। তবে এই চেনা গল্পটাও খানিকটা ভিন্ন দ্যোতনা দেয়, যখন জানা যায়, যিনি নিখোঁজ হলেন, সেই মানুষটিরও আছে এক বিশেষ গল্প। যে গল্পের প্রেক্ষাপট বেশ গভীর৷ অর্থবহ। এবং ঠিক এ পর্যায়ে এসেই 'নিখোঁজ' খানিকটা ভিন্ন রাস্তায় হাঁটা শুরু করে। পাশাপাশি, গল্পবয়ানে নন-লিনিয়ার টাইমলাইনকে বেশ দক্ষভাবে প্রয়োগের ফলে বিষয়টা বেশ উপভোগ্যও হয়। গৎবাঁধা বয়ানে না থেকে গল্প অতীত-বর্তমানের দ্বৈত জংশনে বেশ সুবিস্তীর্ণ ডালপালা মেলে দাঁড়ায় ক্রমশ। যেটা ইতিবাচক। উপভোগ্য। পরিচ্ছন্ন।  

'নিখোঁজ' এর গল্পবয়ান বিস্তর প্রশংসার

যদিও গল্প প্রচণ্ড শ্লথবেগের। এতটাই ধীরগতির এ নির্মাণ, ক্ষেত্রবিশেষে ধৈর্যের চরম পরীক্ষাই দিতে হবে দেখতে দেখতে, এবং, গল্পের বিন্যাসও এমন, কিছুক্ষেত্রে তা বিস্তর অতৃপ্তিই দেবে। গল্পের শেষাংশের যে সমাপ্তি, তাও খুব একটা তৃপ্তিদায়ক না। গল্পের প্রয়োজনেই কিছু ব্যাকস্টোরি আরেকটু ডেভেলপ করা দরকার ছিলো, যা হয়নি। কিছু চরিত্রকে আরেকটু ভালোভাবে লেখা দরকার ছিলো, যেগুলোর দূর্বল কাঠামো বেশ ভুগিয়েছে। কিছু জায়গায় সাসপেন্স বিল্ডআপ আরেকটু ভালো হতে পারতো। বিজিএম, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা লাইটিং এর কিছুক্ষেত্রে উন্নতিরও সুযোগ ছিলো বিস্তর। যদিও এটাও মাথায় রাখা দরকার, নির্মাতা রিহান রহমানের প্রথম ওয়েব সিরিজ এটি। এবং সেটুকু বিবেচনায়, হয়তো খানিকটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে এসব ত্রুটি উপেক্ষা করাই যায়। তবে সামনের সময়ে সতর্ক থাকা অতীব জরুরি। সেজন্যেই কথাগুলো বলা। 

'নিখোঁজ' এর গল্প, গল্পবয়ান কিংবা টেকনিক্যাল দিক যেমনই হোক, সিংহভাগ দর্শকেরই যে আকর্ষণ ছিলো এ নির্মাণের অনসম্বল কাস্টের দিকে, তা আলাদা করে না বললেও চলে। আফসানা মিমি, শতাব্দী ওয়াদুদ, ইন্তেখাব দিনার, খায়রুল বাসার, অর্চিতা স্পর্শিয়া, মাসুম রিজওয়ান... নতুন ও পুরাতন কুশীলবের যে মিলনমেলা বসেছিলো এখানে, সে মিলনমেলা গল্পকে কতটুকু সমর্থন দেবে, তা নিয়েও ছিলো গভীর চাপানউতোর। যদিও সন্তুষ্টির বিষয় এটাই, সবাই-ই করেছেন দারুণ অভিনয়। 'ওটিটি'র সুবাদে 'ফিনিক্স পাখি' হওয়া ইন্তেখাব দিনার এই নির্মাণেও বজায় রাখলেন মুগ্ধতা। মুগ্ধ করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদও। প্রিয় অভিনেত্রী আফসানা মিমির অভিনয়ও প্রাসঙ্গিক। শ্যামল মাওলা, অর্চিতা স্পর্শিয়া কিংবা মাসুম রিজওয়ান... নিজ নিজ জায়গা থেকে সবাই দারুণ। অভিনয়ের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে সবাই যে সাফল্যের সাথেই পাশমার্ক পেয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।

প্রিয় অভিনেত্রী আফসানা মিমির ওয়েব সিরিজে হলো অভিষেক 

'চরকি'র 'শাটিকাপ' কিংবা 'ঊনলৌকিক' এর সাথে তুলনা করলে 'নিখোঁজ' হয়তো খানিকটা পিছিয়েই থাকবে। যদিও ব্যবধান যে খুব বেশি হবে, এমনও না মোটেও। এ নির্মাণের গল্পবয়ান এবং কুশীলবদের অভিনয় যেরকম সাবলীল, গল্প যদি তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আরেকটু সাবলীল হতো, তাহলে খেদের জায়গা পুরোপুরি উবে যেতো বলেই বিশ্বাস। যেহেতু তা হয়নি, সুতরাং, যারাই এ নির্মাণ দেখতে বসবেন, তাদের এটুকু মাথায় নিয়ে বসতে হবে, নতুনত্বের কোনো সন্ধান 'নিখোঁজ' দেবে না। গল্পশেষে চমকেরও সেরকম কোনো ক্ষেত্র নেই। কিন্তু, যা আছে, তাও অবহেলা করার নয় মোটেও। এখান থেকে যা প্রাপ্তি, তা হয়তো গভীরে সেভাবে দাগ কাটবেনা, কিন্তু ভাবাবে বিস্তর। 'নিখোঁজ' এর উৎকর্ষতা সেখানেই। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা