দেবশ্রী রায়ের লিপে 'আমি কলকাতার রসগোল্লা'র মতো চটুল গান গেয়ে যেমন আমজনতার মনে ঝড় তুলেছেন, তেমনই বহু রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েও বিমুগ্ধ করেছেন শ্রোতাদের। শ্রীদেবীর সেই বিখ্যাত 'হাওয়াই হাওয়াই' থেকে ঐশ্বরিয়ার 'নিম্বুরা নিম্বুরা', সব গানেই নিজেকে মানিয়ে নিতেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তি।

২০০২ সালে সঞ্জয় লীলা বানশালির 'দেবদাস' সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক করেই জুরি বোর্ডের সুনজরে পড়েন শ্রেয়া ঘোষাল, পেয়ে যান প্রথম জাতীয় পুরস্কার। কিন্তু সেই একই ছবিতে মার ডালা বা হামেশা তুমকো চাহা'র মতো শ্রুতিমধুর গান করেও জুরি বোর্ডের সুনজরে পড়েননি সেই সময়ের এক সুপ্রতিষ্ঠিত গায়িকা। শ্রেয়া ঘোষাল অবশ্যই ভালো গেয়েছিলেন, তাঁর পুরস্কার ভাগ্যটাও খুব ভালো। কিন্তু দূর্ভাগ্য ছিল সেই গায়িকার, জুরি বোর্ডের ব্রাত্য থেকে গেছেন বছরের পর পর। 

অথচ কত বৈচিত্র্যময় গান নিজের কন্ঠে ধারণ করে মুগ্ধ করেছিলেন। দেবশ্রী রায়ের 'আমি কলকাতার রসগোল্লা'র মতো চটুল গান গেয়ে যেমন আমজনতার মাঝে ঝড় তুলেছেন, তেমন বহু রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়েও বিমুগ্ধ করেছেন শ্রোতাদের। শ্রীদেবীর সেই বিখ্যাত 'হাওয়াই হাওয়াই' থেকে ঐশ্বরিয়ার 'নিম্বুরা নিম্বুরা', সবগানেই নিজেকে মানিয়ে নিতেন। ক্ল্যাসিক্যাল কিংবা মেলোডি- সব মাধ্যমেই ছিলেন পারদর্শী,শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও দেখিয়েছেন প্রতিভা।ভারতীয় উপমহাদেশের সেরা গায়িকাদের নাম নিলে উনার নাম সর্বাগ্রেই থাকবে, তিনি 'কবিতা কৃষ্ণমূর্তি'।

মাত্র নয় বছর বয়সেই সঙ্গীতের সরস্বতী খ্যাত লতা মঙ্গেশকরের সাথে গান করার সুযোগ পান। মুম্বাইয়ে পড়াশুনা চলাকালীন বিভিন্ন জায়গায় গান গাইতেন, সেই সুবাদে হেমন্ত কুমার, মান্না দে, লক্ষ্মীকান্তের সাথে পরিচয়। অবশেষে আসে মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৯৮০ সালে প্রথম সুযোগ পান প্লেব্যাকের। কিন্তু ভাগ্য এত সুসজ্জিত নয়, সিনেমা থেকেই গানটি বাদ পড়ে যায়। ক্যারিয়ারে প্রথম হিট গানের দেখা পান 'পেয়ার ঝুটকা নেহি' সিনেমায় 'তুমসে মিলকার' গানে, তবে সমগ্র ভারতবর্ষে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন মিস্টার ইন্ডিয়া সিনেমায় তুমুল সাড়া জাগানো গান 'হাওয়াই হাওয়াই' গেয়ে, এই সাফল্যেই তিনি হয়ে উঠেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় গায়িকা।

কবিতা কৃষ্ণমূর্তি

নিজেকে কখনো একধারার গানে বেঁধে রাখেননি, কন্ঠে বেঁধেছেন 'সওদাগর মেঁ সওদাগর', মেঁ তুঝে কবুলের মতো গান । কবিতা কৃষ্ণমূর্তির ক্যারিয়ারে অন্যতম মাইলফলক হয়ে থাকবে ১৯৪২: অ্যা লাভ স্টোরি সিনেমার 'পেয়ার হুয়া চুপকে সে' ও রিমঝিম রিমঝিম গান দুটি। মোহরা সিনেমার 'তু চিজ বাড়ি হ্যায় মাস্তি' ও ইয়ারানা সিনেমার 'মেরা পিয়া ঘর আনা', ভিরাসাত সিনেমার 'ঢোল বাজনে লাগার'র মতো জনপ্রিয় গান গেয়ে নিজেকে আরো আলোচিত করে তুলেছিলেন। 'বোম্বে' সিনেমার 'তু হি রে' গানতো রয়েছেই। 'বোলে চুড়িয়ার' মতো তারকাবহুল গানেও নিজের জাত চিনিয়েছেন।

সঞ্জয় লীলা বানসালীর সিনেমায় কবিতা কৃষ্ণমূর্তির গানগুলো যেন বিশেষ হয়ে থাকতো, 'খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল' সিনেমায় 'আজ মেঁ উপর' গান তেমনি একটি উদাহরণ। জাতীয় পুরস্কারের অধরাটা এই গান দিয়েই ঘুচতে পারতো, কিন্তু সেটা আর হয়নি। হাম দিল দে চুকে সানমের 'নিম্বুরা নিম্বুরা'র অত্যন্ত জনপ্রিয় গান গেয়েছেন, দেবদাসের 'মার ডালা', হামেশা তুমকো চাহা আর কাহে ছোড় তো রয়েছেই।

দেবী সরস্বতীর কৃপা ও একাগ্রতায় নিজের কন্ঠকেই বিশেষ করে তুলেছিলেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তি। যে ধরনের গানই তিনি গাইতেন, সেটাই যেন মানিয়ে যেত। আর.ডি বর্মণ, যতিন-ললিত থেকে এ.আর.রহমান সবার সাথেই কাজ করেছেন, কিশোর কুমার, কুমার শানু থেকে উদিত নারায়ণ, হরিহরণ, সনু নিগম সবার সাথেই জুটি বেঁধে সফল হয়েছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী অলকা ইয়াগনিকের সাথেও কন্ঠ মিলিয়েছেন একাধিক গানে।

শুধু হিন্দি গান নয়, মোট ২৫টি ভাষায় তিনি গান করেছেন। দক্ষিণী ভাষার পাশাপাশি বাংলা গানেও তিনি প্রচুর জনপ্রিয় ছিলেন। কলকাতার রসগোল্লার মতো হিট গান ছাড়াও রয়েছে নও তুমি একা নও, ফাগুনের দিন শেষ হবে একদিন, আকাশে-বাতাসে সহ আরো অনেক জনপ্রিয় গান।

১৯৯৯ সালে ড. এল সুব্রিমানিয়ামকে বিয়ে করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকে মনোযোগ দেন, সেখানেও প্রশংসিত হয়েছেন, সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ভক্তিগীতি গেয়েছেন। তবে প্লেব্যাক থেকে ধীরে ধীরে নিজে সরিয়ে নেন, এখন আর চলচ্চিত্রে গান না।

২০০৫ সালে পদ্মশ্রী পেয়েছেন, চারবার ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন। বেশিরভাগ সুপ্রতিষ্ঠিত গায়িকারা জাতীয় পুরস্কার পেলেও কিশোর কুমার, কুমার শানুর মতো তাঁর এই পুরস্কার অধরা থেকে গেছে। দর্শকদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় তিনি আজও স্নিগ্ধ, এই ভালোবাসা তিনি পেয়ে যাবেন চিরকাল।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা