“যখন থেকেই মানুষ দেখা শুরু করলো যে আমি কি করছি সেটা আমি জানি, তখন থেকেই তাদের সন্দেহ দূর হয়ে গেলো, তারা আমাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে শুরু করলো।”

“ যখন থেকেই মানুষ দেখা শুরু করলো যে আমি কি করছি সেটা আমি জানি, তখন থেকেই তাদের সন্দেহ দূর হয়ে গেলো, তারা আমাকে সহজ ভাবে গ্রহণ করতে শুরু করলো”। 

‘গ্যাফার’ ফিল্ম-সেটের শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে সেটে যিনি লাইটিং সংক্রান্ত বিষয়াদির দায়িত্বের প্রধান অর্থাৎ সিনেমার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ আলো কিভাবে পড়বে, কতটুকু পড়বে আর কেন পড়বে- এই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সিনেমার নির্মাতা যার উপর নির্ভর করেন তিনিই হচ্ছেন গ্যাফার বা হেড লাইটিং টেকনিশিয়ান। টেকনিক্যাল থেকে ফিজিকাল- আলোর সব ধরনের কাজ করতে হয় গ্যাফার কে। মানসিক আর শারিরীক-দুইক্ষেত্রেই হতে হয় পারদর্শী যদি গ্যাফার হতে চান। সাধারণ ভাবে, পুরুষেরাই এই সেক্টরে কাজ করে থাকেন। তবে, ব্যাতিক্রম হেতাল দেধিয়া- বলিউডের প্রথম ও একমাত্র নারী গ্যাফার। 

হেতাল দেধিয়া

সমাজ কর্তৃক আরোপিত দায়িত্ব ছাড়াও হেতাল দেধিয়া কাজ করেন ভারি লাইট, তার, নাট-বল্টু আর নানা ধরনের যন্ত্রাংশ নিয়ে। ফিল্মে রোমান্টিক ফিল আনতে হবে? ডাকো হেতালকে। একশন দৃশ্য শ্যুট হবে? হেতাল ঠিক করবেন আলোর ধরন। খুবই দুঃখের কোনো দৃশ্য? যথাযথ অনুভূতি সৃষ্টি করতে আলো ঠিক করবেন হেতাল। মোটকথা, সিনেমার দৃশ্যগুলোকে ঠিক ভাবে ফুটিয়ে তুলতে আলো খুবই গুরুত্বপুর্ণ একটি এলিমেন্ট আর এই দায়িত্ব পালন করেন হেতাল দেধিয়া- বলিউডের মতো পুরুষ-শাসিত ইন্ডাস্ট্রিতে যেটি খুবই ব্যাতিক্রম।

বয়স ৩১ বছর। এর মধ্যেই কাজ করেছেন দেশ-বিদেশের নামকরা সব ফিল্মে। বলিউডের ‘লাক বাই চান্স’, ‘কার্তিক কলিং কার্তিক’ তো আছেই, কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক প্রজেক্টেও- ‘ইট, প্রে, লাভ’, ‘মিশন ইম্পসিবল-ঘোস্ট প্রটোকল’, ‘আন প্লাস আনে’ ইত্যাদি সিনেমায়। এখনো সিনেমার সেটে প্রথম স্মৃতি মনে করতে পারেন দেধিয়া। তিনি বলেন,

"তখন আমার বয়স ১১ বছর। শেখর কাপুরের ব্যান্ডিট কুইনের শুটিং চলছে। ঐ বয়স থেকেই আমি জানতাম আমি আমার বাবাকে অনুসরণ করবো, একজন গ্যাফার হয়ে সিনেমার সাথে জড়িত থাকবো। আমার আজকে এতোদূর আসার পেছনে আমি আমার বাবাকে কখনোই ভুলবো না।"

মজার ব্যাপার হচ্ছে, ‘লাইট এন্ড গ্রিপ্স ইকুইপমেন্ট হায়ারারস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’-এটি হেতালের পারিবারিক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান। হেতালের বাবা মালচন্দ ১৯৯৩ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।  হেতালের দুইবোন মিনাল আর জিনাল- তাদের পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করেন।  পরিবারের মধ্যেই তার গ্যাফার হওয়ার ভাগ্য লিখিত ছিলো বলে মনে করেন হেতাল। তার মতে, “ব্যাপারটা বংশগত, আমার পরিবারের সাথেই সিনেমা মিশে আছে।”

হেতাল দেধিয়া

লাইটিং ওয়ারহাউসে তার গ্যাফার হওয়ার প্রথম শিক্ষা পান। এরপর গ্যাফারদের এসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করেছেন, কাছ থেকে দেখেছেন কিভাবে ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফির দায়িত্বে থাকা মানুষেরা কাজ করেন। ফলে অনেক আগে থেকেই দৃশ্য আর আলো- এই দুটি  ব্যাপারের সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠে। ছয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষে তিনি পরিপূর্ণ গ্যাফার হয়ে উঠেন। প্রথম প্রথম তার বাবাও অনিশ্চিত ছিলেন যে হেতাল গ্যাফার হতে পারবে কিনা যেহেতু সেই যুগে কোনো নারী গ্যাফার ছিলো না আর তারা যে সংস্কৃতি তে বড় হয়েছেন, সেখানে নারী গ্যাফার খুবই অপ্রচলিত ক্যারিয়ার চয়েস। তবে পরবর্তী তিনি মেয়ের সিদ্ধান্ত কে সম্মান জানান। পুরষদের কাজ বা পরিবারের প্রভাব- সবকিছুকে ছাপিয়ে তিনি নিজের যোগ্যতায় হয়ে উঠেন বলিউডের প্রথম নারী গ্যাফার। 

গ্যাফার ছাড়াও তিনি সিনেমাটোগ্রাফারের এসিস্ট্যান্ট হিসাবে কাজ করেছেন, তার মেন্টর ছিলেন জ্যাসন ওয়েস্ট। লাইটিং থেকে ক্যামেরা- এই পরিবর্তনটা তিনি দারুণ উপভোগ করেছেন। তবে আকর্ষনীয় দৈহিক গঠন আর চুলের জন্য তাকে অনেক সময়ই ক্যামেরার সামনে বিভিন্ন চরিত্রের জন্য প্রস্তাব দেয়া হলেও কখনোই অভিনয়ে নাম লেখাননি ভারতের প্রথম ও একমাত্র নারী গ্যাফার হেতাল দেধিয়া। বলিউডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে তবে হেতালের মতো এমন যুগান্তকারী ক্যারিয়ার বেছে নেয়া আজকের সমাজে বিরল। নিঃসন্দেহে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য তিনি ভালো উদাহরণ হয়ে থাকবেন। 


ট্যাগঃ

শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা