মহাপ্রয়াণের পথে যে ফকির আলমগীর, তাকে পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখবে কী না, জানা নেই কারো। তবে দরাজ কন্ঠ আর ঝাঁকড়াচুলের এই গানপাগল মুক্তিযোদ্ধাকে মনে রাখবে সময়, ইতিহাস। তাঁর প্রয়াণে যে বিষাদ, তাঁর অনুপস্থিতিতে যে শূন্যস্থান, তা থেকে যাবে অমোচনীয়, তা হয়ে রইবে অপূরণীয়...

একাত্তরের সাতই মার্চ। রেসকোর্স ময়দানে আসবেন বঙ্গবন্ধু। দেবেন স্বাধীনতার ঘোষণা। যে ঘোষণা শোনার জন্যে সকাল থেকে মাঠে এসে হাপিত্যেশ করছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। অজস্র কালো কালো মাথার এই জনস্রোতে আছে অল্পবয়স্ক এক তরুণও। যে তরুণের ইচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেই নেমে পড়বে যুদ্ধে। যথারীতি বঙ্গবন্ধু এলেন। অমোঘ বার্তা দিলেন। সে বার্তাকে বুকের ঢাল বানিয়ে অনেকের পাশাপাশি এই তরুণও নেমে পড়লেন যুদ্ধে। স্বাধীনতার যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে।

যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মার্চের তেইশ তারিখ। ঢাকার সব স্থান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হচ্ছে সেদিন। রেসকোর্স ময়দানের সেই তরুণকে দেখা গেলো এবারেও। খিলগাঁওয়ের যেই এলাকায় সে থাকে, সেখানের প্রত্যেক বাসা-বাড়ি-অফিসের সামনে প্রবল উৎসাহে সেদিন সে ওড়ায় 'বাংলাদেশ' এর পতাকা। কিছুদিন পরে এই তরুণ চলে যায় ভারতে। অস্ত্র হাতে ট্রেনিং নেয়। কিন্তু রণাঙ্গনের এই যুদ্ধ ভালো লাগে না তাঁর। তিনি বুঝতে পারে, এই যুদ্ধে হবে না। তাঁর যুদ্ধ হবে আরেকটু অভিনব। তিনি যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সাথে, শুরু করেন কণ্ঠযুদ্ধ। পুরো যুদ্ধকালে যার কন্ঠে, গানে অনুপ্রেরণা পায় লাখো মুক্তিযোদ্ধা। দেখতে দেখতে শেষ হয় আগুনের দিন। যুদ্ধ শেষের ঘোষণা যেদিন আসে, সেদিন এই তরুণ হাতের মুঠোয় পতাকা নিয়ে বেরিয়ে আসেন রাস্তায়। উদভ্রান্তের মত দৌড়াতে থাকেন,  কাঁদেন, গাইতে থাকেন- 

বিজয় নিশান উড়ছে ঐ

পিছিয়ে যাই যুদ্ধের কিছুকাল আগে। পটভূমি- ফরিদপুরের ভাঙ্গা। যেখানের অকৃত্রিম আলো-হাওয়ায় বেড়ে উঠছে রেসকোর্স ময়দানের সেই তরুণ। অবশ্য যখনকার কথা বলছি, তখন সে সদ্য কিশোর। যে এলাকায় তার বসবাস, সে জনপদে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি তখনো শেষ হয়ে যায় নি। কীর্তন আর বাউল গানের আসর বসে নিয়মিত। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই সবরকমের গান শোনে, সব গানের চর্চা হয় নিয়মিত। আমাদের এই কিশোরের ছোটবেলা থেকেই গানের দিকে ঝোঁক। তাকে নিয়মিতই পাওয়া যায় গানের বিভিন্ন সব আসরে। দেশজ নানা গানের নিয়মিত আয়োজনে আকন্ঠ ডুবে থাকে সে। এতেই তার স্বস্তি, প্রশান্তি। 

বাবার হাত ধরে এই কিশোর নিয়মিত ছুটে যায় এক গানের আসর থেকে আরেক গানের আসরে। মনোযোগ দিয়ে গান শোনে। সুর তোলার চেষ্টা করে গলায়। গলাটাও দরাজ তার। ঈশ্বর যেন প্রতিভার পুরোটাই ঢেলে দিয়েছেন এখানে। সেই ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার বিচ্ছুরণেই হয়তো ছেলেটার গলায় গানের সুরগুলো খাপ খেয়ে যায় দারুণভাবে। আস্তে আস্তে গান হয়ে যায় তার জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গান নিয়ে ক্রমশ এগোতে এগোতে এই কিশোর হয়ে যায় বাংলাদেশের সবার খুব প্রিয় একজন মানুষ, যার নাম- ফকির আলমগীর।

পাঁচ দশকের সঙ্গীত-যাত্রার অবসান ঘটলো গতকাল! 

সংগীতের অনেক ধারার সাথেই সখ্যতা ছিলো তাঁর, তবুও বেছে নিয়েছিলেন গণসংগীতকে। অবশ্য নেবেন নাও বা কেন! তিনি বিশ্বাস করতেন, সঙ্গীত এর সাথে 'গণ' যুক্ত করলেই গান আলাদা প্রাণ পায়, সত্তা পায়। এই  প্রাণের অনুসন্ধানের পেছনেই তাই তিনি কাটিয়েছেন আজীবন। বায়ান্নো, চুয়ান্ন, বাষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর বা কালের যেকোনো প্রকোষ্ঠ...নিয়মিতই আঁকড়ে ধরেছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গীতকে, গণসংগীতকে। কন্ঠ হয়েছেন কন্ঠহীনের, গলার সুরে জানিয়েছেন প্রতিবাদ। গান আর কার কাছে কী অবতারে প্রকটিত হয়, জানা নেই; তবে ফকির আলমগীরের ক্ষেত্রে গান ক্রমশই হয়েছে আগুন-বারুদ- প্রতিবাদের প্ল্যাকার্ড। 

মাঝেমধ্যেই কাছের মানুষজনদের কাছে নিজের ভাঙ্গা গলা নিয়ে আক্ষেপ করতেন। তবু এই ভাঙ্গা গলাকে সঙ্গী করেই গেয়েছেন কালজয়ী সব গান। বিটিভির 'আনন্দমেলা'য় প্রথমবার 'ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে' সম্প্রচারিত হওয়ার পরে পুরো দেশ একাট্টা হয়ে যেভাবে মজে ছিলো এ গানে, তা খুব কম গানের ক্ষেত্রেই হয়েছে। ফকির আলমগীর 'সখিনা'কে নিয়ে শুধু একটি গানেই থেমে থাকেন নি। আরো গান গেয়েছেন। প্রতিবাদের এক অবতারেই তিনি শেষমেশ রূপান্তরিত করেন 'সখিনা' নামের রহস্যময়ী এই রমণী কে। নব্বইয়ের দশকে সামরিক শাসন-যন্ত্রকে কটাক্ষ করেছেন গানের সুরে। সামাজিক নানা অসঙ্গতিকেও তিনি উঠিয়ে এনেছেন 'কালো কালো মানুষের দেশে' কিংবা 'দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা' গানে। আবার এই প্রতিবাদের গানেই আটকে থাকেন নি শুধু।অন্যধারার গানও গেয়েছেন সমানতালে।  'মায়ের একধার দুধের দাম' গানে উঠে এসেছে মাতৃপ্রেম। 'বনমালী তুমি' বা 'ঘর করলাম না রে আমি'র মতন প্রণয়সূচক গান গেয়েছেন। 'মন আমার দেহ ঘড়ি'র মতন আধ্যাত্মিক গানও গেয়েছেন।

প্রতিবাদে বরাবরই থাকতেন সরব! 

মুক্তিযুদ্ধের পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে তিনি শুরু করেছিলেন গণসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করার কাজ। শেকড়ের গানের সাথে পাশ্চাত্যের সুরের সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন ধারার গানের প্রচলন হয় এ সময়ে। নেপথ্যে থাকেন ফকির আলমগীর, আজম খান, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজ ও অন্যান্যরা। যুদ্ধের আগে থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন 'ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী' এবং 'গন শিল্পী গোষ্ঠী'র সাথে। যুদ্ধের পরে এই দুই সংগঠনে থাকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন 'ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী।' গনসংগীত সমন্বয় পরিষদ এর সভাপতিও হন তিনি। মাথায় দায়িত্বের পর্বতসমান চাপ নিয়ে জনমানুষের গান নিয়ে ছুটে বেড়াতে থাকেন এদেশ থেকে ওদেশে। স্বপ্ন দেখতেন- গণসঙ্গীত একাডেমি হবে বাংলাদেশে। গণসঙ্গীতকে প্রাতিষ্ঠানিক এক রূপ দেবেন তিনি, আশা করতেন সেটিও। এসবের পাশাপাশি লিখতেন। গণসঙ্গীত, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছিলেন তেরোটিরও মতন বই। যেসব বই দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা, গভীর গবেষণায় ঋদ্ধ। 

লিখেছেন একাধিক গবেষণামূলক বইও! 

পহেলা বৈশাখের টিএসসি, গুণী কোনো মানুষের প্রয়াণের পরে শহিদ মিনার অথবা সামাজিক কোনো সংকটে রাজপথ...এই মহীরুহ মানুষটিকে বরাবরই দেখেছি সম্মুখ সারিতে। সেই মানুষ আজ আবারও এসেছিলেন শহিদ মিনারে,  অন্য অবয়বে, অন্তিম শয়ানে। অনন্ত নক্ষত্রবীথির ওপারে যাওয়ার জন্যে শায়িত যে ফকির আলমগীর, তাকে পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখবে কী না, জানা নেই কারো। তবে দরাজ কন্ঠ আর ঝাঁকড়াচুলের এই গান-পাগল মুক্তিযোদ্ধাকে মনে রাখবে সময়, ইতিহাস, কালের বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা। তাঁর প্রয়াণে যে বিষাদ, তাঁর অনুপস্থিতিতে যে শূন্যস্থান, তা থেকে যাবে অমোচনীয়, তা হয়ে রইবে অপূরণীয়। 

বিনম্র শ্রদ্ধা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা