শেকড়ের যে গানগুলো ভুলতে বসেছি, যে গানগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে জীবন-রসের অভাবে, খুব করে চাইবো, 'কোক স্টুডিও'র ঝলমলে মঞ্চে ঠাঁই পাবে তারা। পাবে বেঁচে থাকার রসদও। তাহলেই তৃপ্তি।'কোক স্টুডিও বাংলা' ছাপিয়ে যাবে উপমহাদেশের বিগত সব সমীকরণ, এটাই প্রত্যাশা। বাকিটা নাহয় সময়ই বলুক। অপেক্ষা। 

এই ভূখণ্ডের মানুষ ঝঞ্ঝাটপ্রিয়। কিন্তু তারচেয়েও বেশি গানপ্রিয়। যত দ্বন্দ্ব, যত রেষারেষি, যা কিছুই থাকুক, 'গান' নামক এই অপার্থিব বিষয় কোনো এক অদ্ভুত সম্মোহনে তাদের বরাবরই আনে কাছে৷ করে স্থানু৷ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বিখ্যাত চরিত্র 'গুপী গাইন' এর গান শুনলে যেমন থেমে যায় সব, সেরকমটা হয় আমাদের ক্ষেত্রেও। যুদ্ধদিনের 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' থেকে সমসাময়িক আর্টসেল-শিরোনামহীন, নৌকার মাঝি থেকে জটলার গানওয়ালা ...গান নিয়ে আমাদের বাতিক ক্ষণে ক্ষণে, নানা রাংতার মোড়কে ক্রমশই প্রকাশিত হয়। চমকায়। মুগ্ধ করে। সুখ, শোক, ব্যথা, বিপ্লব... আর কিছু থাকুক আর না থাকুক, 'গান' নামক এই সঞ্জীবনী সুধা বরাবরই আমাদের সাথে মিশে থাকে ওতপ্রোতে। নিভৃতে। 

গান নিয়ে এরকম উন্মাতাল হয়তো উপমহাদেশের সবাই-ই। নমস্য 'লতা মঙ্গেশকর' এর প্রয়াণে যেভাবে একইসাথে বিমর্ষ হলো গোটা উপমহাদেশ, তাতে বোঝা গেলো গান ও গানের মানুষ আমাদের ঠিক কতটা আপনজন, কতটা কাছের। যদিও মহান এ শিল্পীর প্রয়াণ-জনিত শোক এখনো হয়নি স্তিমিত, তবুও এরইমধ্যে দৈবাৎ পাওয়া গেলো একটু স্বস্তির বার্তা। বেশ কিছুদিন ধরেই যে চাপানউতোর চলছিলো, সেই রাখঢাকের পর্দা টুটিয়ে জানা গেলো, 'কোক স্টুডিও' এসেছে বাংলাদেশে। বিক্ষুব্ধ এ সময়ের ভ্যাপসা গরমে একচিলতে 'লিলুয়া বাতাস'এর স্বস্তিটুকুই যেন দিলো এ নিদান! 

সবারই জানা, 'কোক স্টুডিও' উপমহাদেশে বহুদিন থেকেই আছে। পাকিস্তান ও ভারতে এই ফ্রাঞ্চাইজির ফিউশন মিউজিক বেশ জনপ্রিয়ও। বহু বছর ধরেই তারা সঙ্গীতের নব নব সংস্করণে বুঁদ করে রেখেছে সঙ্গীতপ্রেমীদের। অন্তর্জালের সুবাদে এদেশের মানুষও সেই সব সুর-লয়-তালের পেলব স্বাদ থেকে বঞ্চিত হননি কখনোই৷ কিন্তু তবুও উচাটন আক্ষেপ ছিলো। নিজেদের ভাষায়, নিজেদের শিল্পীর গাওয়া নিজেদের গান আসবে এই মঞ্চের কল্যানে, সে চাওয়াটুকুও ছিলো বরাবরই উপস্থিতি। এবং সে আশাই পূরণ হতে যাচ্ছে এবার। 

তবে সেই আয়োজন নিয়ে বলার আগে 'কোক স্টুডিও' এর অতীত ঘেঁটে যদি দেখি, এই আয়োজনের একেবারে গোড়ার দিকে যদি তাকাই, ইতিহাসের হলদেটে পৃষ্ঠা যদি আলগোছে উল্টাই, দেখবো- এই আয়োজন প্রথম শুরু হয়েছিলো ব্রাজিলে। তবে এই শুরুর গল্পের পেছনেও আছে অন্য আরেক গল্প। সেটা দিয়েই শুরু করি। 

'কোকা-কোলা' একবার একটা ছোটখাটো মিউজিক প্রোগ্রাম অ্যারেঞ্জ করে ব্রাজিলে। খানিকটা অভিনব এক মিউজিক্যাল শো করতে হবে, এই চিন্তা থেকে করা সেই আয়োজনে কনসার্টের মত করে এক মঞ্চ বানানো হয়। সে মঞ্চে অজস্র মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টস ব্যবহার করে নানারকম গানের ফিউশন করা হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার এটাই, এই অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয় হয় ব্রাজিলে। জনগনের তুমুল সাড়া দেখে কোকো-কোলার এক কর্মকর্তা ভাবেন, এই সফল কনসেপ্টকে 'কোকা-কোলা'র সাথে পাকাপাকিভাবে যুক্ত করে কোনো একটা মিউজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট করলে বেশ হয়। যে কর্মকর্তার কথা বলছি, তার নাম নাদিম জামান, তিনি ছিলেন কোকা-কোলার মার্কেটিং হেড। নাদিম জামান এরপর পাকিস্তানে নিজ কর্মস্থলে আসেন, পাকিস্তানের পপ ব্যান্ড 'ভাইটাল সাইনস' এর সাথে যোগাযোগ করেন। সেই ব্যান্ডের লিডার রোহিল হায়াত কথাপ্রসঙ্গে এক আইডিয়া দেন- পাকিস্তানে 'ব্রাজিল' এর এই মডেল অনুসরণ করে একটা শো বানানো যেতে পারে। খানিকটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখা যেতে পারে, গানের ফিউশন কতটা পছন্দ করবে এখানকার মানুষজন! 

শুরু হয় পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের কাজ। বিস্তর খাটাখাটুনির পর অবশেষে 'কোক স্টুডিও-পাকিস্তান' এর প্রথম সিজন জনসম্মুখে উন্মোচিত হয় ২০০৮ এর জুনে। প্রথম সিজনে লাইভ অডিয়েন্সের সামনে পারফর্ম করেন শিল্পীরা। গানগুলো গাওয়া হয় একেবারেই আনকোরা মোড়কে। ওয়েস্টার্ণ এবং রিজিওনাল মিউজিককে একত্রে মিশিয়ে যে অনবদ্য ফিউশন করা হয়, তা তুমুল সাড়া ফেলে। এই শো জনপ্রিয় তো হয়ই, সমালোচকদের দৃষ্টিতেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয় 'কোক স্টুডিও। কিন্তু তবুও এই সফল ফরম্যাটকে পুরোপুরি রাখা হয়না। খানিকটা কাটছাঁট করা হয়। দ্বিতীয় সিজনে 'লাইভ অডিয়েন্স' বাতিল করা হয়। স্টুডিওর মধ্যে বাদ্যযন্ত্র আর যন্ত্রীদের সমন্বয়ে গানের আয়োজন শুরু হয়। সংশোধিত এ আয়োজনই শেষমেশ থেকে যায় পাকাপোক্তভাবে। বলা বাহুল্য, এ ফরম্যাট প্রথমবারের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় হয়। এবং এটাও বলা বাহুল্য, 'কোক স্টুডিও' নামক জনপ্রিয় মঞ্চের দোর্দণ্ডপ্রতাপ যাত্রা এখান থেকেই হয় শুরু। 

কোক স্টুডিও বাংলা! 

'কোক স্টুডিও- পাকিস্তান' এর তুমুল সাফল্য এই ফ্রাঞ্চাইজিকে এনে দেয় গ্লোবাল রিকগনিশন। টনক নড়ে ভারতের। তারাও এই ফ্রাঞ্চাইজিকে নিয়ে আসে তাদের দেশে। ভারতীয় মিউজিকে এমনিতেও ভ্যারাইটি কম না, তাছাড়া নানারকম লোকাল ইনস্ট্রুমেন্টস যুক্ত হয়ে পুরো আয়োজন হয়ে পড়ে আরো খোলতাই। 'কোক স্টুডিও' এর রমরমা এই আয়োজন দেখে আগ্রহী হয় মধ্যপ্রাচ্যও। এই আয়োজনের আরব ভার্সনও যাত্রা শুরু করে কয়েকদিনের মধ্যেই। সম্প্রতি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও হচ্ছে 'কোক স্টুডিও' এর আয়োজন। 

সারাবিশ্বের অনেক মানুষই 'কোক স্টুডিও' এর নিয়মিত দর্শক। তবুও কেউ যদি জানতে চান, কেন এই আয়োজন এত জনপ্রিয়, এই প্রশ্নের জবাবে 'কোক স্টুডিও' এর কোনো একটি এপিসোড দেখাটাই হবে তার জন্যে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক উত্তর। কোনো একটা গানের মিউজিক কম্পোজিশন তারা যেভাবে করেন, এবং সেখানে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য-স্থানীয় বাদ্যযন্ত্রের যেরকম আশ্চর্য সহাবস্থান থাকে, তা সমাজের তৃণমূল স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর... সবাইকেই ছুঁয়ে যায়। গান-সুর-লয়ের যে কোনো কাঁটাতার হয় না, হয় না কোনো স্থান-কাল-পাত্র, সেটাই যেন বারবার প্রমাণ করে 'কোক স্টুডিও'র এই অদ্ভুত ঝলমলে মঞ্চ। তারতম্যের বিভাজন ঘুচিয়ে নিবিড় এক সারল্যের কথাই বলে প্রতিটি গান, প্রতিটি আয়োজন। 

'কোক স্টুডিও বাংলা'য় থাকবে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রাবল্যও! 

সেই 'কোক স্টুডিও' বাংলাদেশে এসেছে,  বাংলাদেশের মাটির গান নিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে, এই সংবাদে বাংলাদেশের মানুষ খুশিতে ডগমগ করবেনা, তাও বা কি করে হয়! এবং সেটা হয়নিও। যারপনাই খুশি হয়েছে এদেশের মানুষ, রীতিমতো মুখিয়ে আছে এই উদ্যোগের অংশ হবার জন্যে। গতকাল মুক্তি পাওয়া 'কোক স্টুডিও বাংলা'র প্রোমো ভিডিও দেখে সে উৎসাহ বেড়েছে আরো কয়েকগুণ। সামিনা চৌধুরী, বাপ্পা মজুমদার, মমতাজ, অর্নব, মিজান, কণা তো আছেই, পাশাপাশি নবীন কিছু শিল্পীকেও যেভাবে নিয়ে আসা হয়েছে এই মিউজিক কম্পোজিশনে, ভালো লেগেছে। বাদ্যযন্ত্রেও এসেছে বৈচিত্র‍্য৷ তবলা থেকে গিটার, হারমোনিয়াম থেকে বেহালা, কিবোর্ড থেকে একতারা... এসেছে সবই। অভিনব রূপকে। পাশাপাশি দৃশ্যায়নেও বজায় থেকেছে মুগ্ধতা,  আনকোরা গ্রামের চালচিত্র। 'একলা চলো'র পাশাপাশি বেজে উঠেছে 'হাসিমুখ'ও। গ্রামবাংলা, প্রকৃতির অমোঘ টান আর রবিঠাকুরের গান... আহা! 

একঝাঁক শিল্পী! 

লেখার শুরুতেই জানিয়েছিলাম, এই বদ্বীপের মানুষ গানপাগল। যে যাপিত যন্ত্রণা, বৈষম্য, নিপীড়নে প্রতিদিন বেঁচে থাকে এ অঞ্চলের মানুষ, 'গান' নামক অলীক বস্তুর সাথে এখানের মানুষের সংশ্রব থাকার কথাই ছিলো না। কিন্তু সংশ্রব আছে। 'সঙ্গীত' এর সাথে ওতপ্রোত সম্পর্ক থাকার কারণেই আছে। আশা থাকবে, আমাদের পাগলামির-খ্যাপামির সে গানকেই আরেকটু স্বকীয়  মোড়কে আনবে 'কোক স্টুডিও বাংলা।' শেকড়ের যে গানগুলো ভুলতে বসেছি, যে গানগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে জীবন-রসের অভাবে, খুব করে চাইবো, 'কোক স্টুডিও'র ঝলমলে মঞ্চে ঠাঁই পাবে তারাও। পাবে বেঁচে থাকার রসদ। তাহলেই তৃপ্তি। 'কোক স্টুডিও বাংলা' ছাপিয়ে যাবে উপমহাদেশের বিগত সব সমীকরণ, এটাই চাওয়া। বাকিটা নাহয় সময়ই বলুক। অপেক্ষা। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা