অপার্থিব এই সিনেমা দেখে যে সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স এর মুখোমুখি হলাম, সে এক্সপেরিয়েন্স মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিতে কেন, অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতেও বেশ বিরল। 'চুরুলি' ক্রমাগত এটাই বুঝিয়ে গিয়েছে, গ্রে ম্যাটারে গল্পের মত গল্প থাকলে, এ গল্প স্তব্ধ করে দিতে পারে সবাইকেই। দর্শককে নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারে। শেষে এসে দর্শককে এ প্রশ্ন করতেও বাধ্য করতে পারে, যা দেখলাম তা কী স্বর্গ-নরক নিয়ে হাইপোথিসিস? নাকি কোনো ঘোরগ্রস্ত মানুষের ঘামে চিটচিটে স্বপ্ন? নাকি কিছুই না!

ধরা যাক একটা গ্রাম, যে গ্রামের অধিবাসী মানুষজন গাণ্ডেপিণ্ডে খেতে পারে সারাদিন, চাইলে অবাধ মদ্যপানে বিভোর থাকতে পারে রাতদিন, চাইলে যে কাউকে যে কোনো মুহুর্তে খুন করে জান্তব তৃপ্তি পেতে পারে তারা, স্বেচ্ছাচারিতায় চূড়ান্ত করতে পারে যে কেউ... সে গ্রামকে কী বলা যায়? স্বর্গ? 

আবার সেই একই গ্রাম, যে গ্রামে মোবাইল, রেডিও কিছু নেই, দিনের বেলাও যেখানের বাতাসে মিশে থাকে গভীর কুয়াশার আস্তর, ঝিঁঝি আর অজানা তক্ষকের ডাকের সাথে বন্য সরীসৃপের দীর্ঘশ্বাস মিলে আধিভৌতিক সুর তৈরী হয় যেখানে, যে গ্রাম থেকে চাইলেও বের হওয়া যায় না, যে গ্রামের মানুষেরা একেকজন সাক্ষাৎ পিশাচ... সে গ্রামকে কি বলা যায়?  নরক? 

শুরু করি, পুরাকালের এক গল্প দিয়ে। এক ব্রাহ্মণ একবার মাথায় এক ঝুড়ি নিয়ে জঙ্গলে ঢুকলেন, জঙ্গল থেকে অশুভ আত্মাকে ধরে লোকালয়ে নিয়ে আসার জন্যে। জঙ্গলে ঢুকে বহুদূর হাঁটার পরে তিনি রাস্তায় এক প্রাণীকে পেলেন। ভাবলেন, তার সন্তানেরা এই প্রাণীটি পেয়ে খুশি হবে। যা ভাবা তাই কাজ। ব্রাহ্মণ তার মাথার ঝুড়িতে প্রাণীটিকে তুলে নিলেন। আবার শুরু করলেন অশুভ আত্মার খোঁজ। রাতদিন এভাবে হেঁটে হেঁটে পথের ঠিকানা একসময়ে হারিয়ে ফেললেন তিনি। তাও অনুসন্ধান বন্ধ হলো না। ক্রমশই তিনি ঘুরপাক খেতে লাগলেন জঙ্গলের শাখাপ্রশাখায়। অথচ ব্রাহ্মণের জানা হলো না, ঝুড়িতে যে প্রাণীকে নিয়ে তিনি ঘুরছেন, সেটিই জঙ্গলের অশুভ আত্মা। তার এও জানা হলো না, তিনি আর জীবনেও বের হতে পারবেন না এ জঙ্গল থেকে। কারণ, এ জঙ্গলে একবার ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না।

'চুরুলি' সিনেমার শুরুতেই পুরাকালের এক মিথের অ্যানিমেটেড সংস্করণ দেখে এটা বেশ ভালোই বুঝতে পারা যাচ্ছিলো, গল্পের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে এ গল্পের। প্রোলোগের এই মিথের পরপরই শুরু হয় মূল গল্প, যেখানে দুই পুলিশকে পাই আমরা, যারা ছদ্মবেশে ভিড়ভাট্টার বাসে চেপে যাচ্ছেন 'চুরুলি' নামের এক গ্রামে। যেখানে বহু বছর ধরে লুকিয়ে আছে এক দাগী আসামী। তাকে ধরে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হাতে সোপর্দ করাই এই দুই পুলিশের দায়িত্ব। দুই পুলিশ সদস্যের একজনের নাম- অ্যান্থনি। আরেকজন- সজীবন। 

অ্যান্থনি ও সজীবন! 

বাসের পথ শেষ হয় এক সময়ে। সামনে বিস্তীর্ণ জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যেই কোনো এক পাণ্ডববর্জিত স্থানে 'চুরুলি' গ্রাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মত কোনো বাহন কিংবা বাহকের দেখা নেই। কিভাবে যাওয়া যাবে সেখানে, তা নিয়ে দুই পুলিশ সদস্য ভেবে ভেবে যখন কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে,  তখনই এক ভাঙ্গাচোরা জিপ নিয়ে হাজির হয় এক গ্রাম্য মানুষ। সে জানায়, সে জিপে করে 'চুরুলি' গ্রামে নিয়ে যাবে তাদের। খুশিতে ডগমগ করে সজীবন ও অ্যান্থনি উঠে পড়ে জিপে।

জিপে আস্তে আস্তে যুক্ত হয় আরো কিছু হতদরিদ্র, মলিন মানুষ। যারা সবাই 'চুরুলি' গ্রামের অধিবাসী। সজীবন ও অ্যান্থনি অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সাথে খাতির জমিয়ে বসে। গ্রামবাসীদের ব্যবহারও মিষ্টি। অল্পভাষী, মিষ্টি হাসিতে তারাও সামিল হয় কথাবার্তায়। সর্পিল জঙ্গুলে রাস্তা, পাহাড়ি চড়াই-উতরাই, পাথুরে রূক্ষ ভূমি, মাঝেমাঝে কথাবার্তা... এভাবে যায় কিছুক্ষণ। কিছুক্ষণ পড়েই সামনে দৃশ্যমান হয় কাঠ দিয়ে বানানো এক সেতু। সবাই হেঁটে সেতু পার হওয়ার পরে জিপ নিয়ে জিপের ড্রাইভার বহু কসরত করে পার হন বিশেষ এ সেতু। সেতু পার হওয়ার এই সীনে নানা অ্যাঙ্গেল থেকে প্রায় দুই মিনিটেরও বেশি সময় ধরে জিপকে দেখানো হতে থাকে। এই সীনের দৈর্ঘ্য ও প্রগাঢ়তা দেখে ঠিক তখনই খটকা লাগে, কী রহস্য এই সেতুর? কেন এতক্ষণ ধরে দেখানো হচ্ছে বিশেষ এ সেতুকে? 

সে প্রশ্নের উত্তর মেলে একটু পরেই। সেতুর ওপারে যাওয়ার পরেই গ্রামবাসীর আচরণে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যে গ্রামবাসীরা একটু আগেই স্বল্পভাষী ও মিষ্টি হাসি দিয়ে কথা বলছিলো, তারাই অকস্মাৎ খিস্তিখেউড় শুরু করে। অনর্গল কথা, হাতাহাতি ও গালিগালাজে রাতারাতি পালটে যায় তাদের আচরণ। দুই পুলিশ অফিসার বুঝতে পারে, কিছু একটা গড়বড় আছে এখানে। নাহলে কাঠের সেতু পার হয়ে এপারে আসার পরেই আচরণে এরকম পরিবর্তন কেন সবার?

মনে খটকা নিয়ে একসময়ে তারা পৌঁছে যায় 'চুরুলি' গ্রামে। তাদের স্থান হয় এক শুঁড়িখানায়। সেখানেই খাওয়া। সেখানেই ঘুম। রাতের বেলায় অদ্ভুত মুখোশ পরা কিছু প্রাণীর সাথে আচমকা সাক্ষাত। রহস্যময় লাল গোলকের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে যাওয়া। কারণে-অকারণে কারো না কারো মারমুখী হয়ে ওঠা।  আস্তে আস্তে সময়, দিন-রাত্রির হিসেব কিংবা যে লক্ষ্যে এখানে আসা দুই পুলিশ অফিসারের... তা ক্রমশ ফ্যাকাশে হতে থাকে। এরমধ্যেই একদিন আসে অদ্ভুত এক চমক! গল্পে আসে মোচড়। 

থমথমে শুঁড়িখানা! 

এ বছরে যে কয়টা মালায়ালাম সিনেমা দেখেছি, তার মধ্যে 'চুরুলি' নিঃসন্দেহে উপরের দিকেই থাকবে। এই সিনেমার গল্পে কল্পবিজ্ঞান আছে, ভৌতিক উপাদান আছে, রোমাঞ্চ আছে, থমথমে ভয়াবহতাও আছে। কোন জনরায় এ সিনেমার গল্পকে ফেলা যাবে, তা ভাবতে ক্রমশই বেগ পেয়েছি। আর যে লোকেশনে এই সিনেমার শুটিং, ইদুক্কির কুলামাভু গ্রাম, সে জায়গাকে বিশেষায়িত করার জন্যে 'ভয়ঙ্কর সুন্দর' শব্দ দুটির চেয়ে ভালো কোনো শব্দ বোধহয় নেই। প্রাগৈতিহাসিক সব গাছের নিশ্চুপ কটাক্ষ, ভগ্ন শুঁড়িখানার ঠাণ্ডা শীতল অবয়ব,  আশেপাশের মানুষের জান্তব দৃষ্টি কিংবা রাতের আঁধারের অদ্ভুতুড়ে সব ঘটনা... একটি গল্পকে কিভাবে 'জমাটি রহস্যের খাসমহল' বানানো যায়, তা নির্মাতা লিজো জোশে পেলিসারির কাছ থেকে শেখা উচিত সবার। 

লিজোর সিনেমা আমি বরাবরই বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখি। ডাবল ব্যারেল, জালিকাট্টু, ই.মা.ইউ, অ্যাঙ্গামালি ডায়েরিস কিংবা চুরুলি...সিনেমাগুলো যদি কেউ পরপর দেখেন, তাহলে দেখবেন, লিজো এক গল্প নিয়ে বারবার কাজ তো করেই না, এক ডিরেকশন স্টাইল নিয়েও বারবার কাজ করেন না। অ্যাঙ্গামালি ডায়েরিজ কিংবা জালিকাট্টুতে যেভাবে একের পর এক সীন আসছিলো, রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছিলো সিনেমার গল্প, শটের পর শট ঢুকে যাচ্ছিলো... সেখান থেকে 'চুরুলি' একেবারেই ভিন্ন। গল্পের শুরু থেকেই এক ঢিমেতালের আবহ। গল্পকে আস্তে আস্তে গাঢ় করে নেয়া, উপাদানগুলোকে পরখ করে নেয়া। এভাবে এগোতে এগোতে যখন ক্লাইম্যাক্সে আসা...বিস্ফোরণ। এমন অদ্ভুত ক্লাইম্যাক্স দেখিনি বহুদিন। বিজেএম এর অদ্ভুত সুন্দর সাহচর্য, গল্পের প্রাসঙ্গিক পরিণতি কিংবা সিনেম্যাটোগ্রাফীর অপার্থিব বিন্যাস...লিজো জোশে পেলিসারি আবার বুঝালেন, কেন তিনি মালায়ালাম সিনেমার খ্যাপাটে নির্মাতাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। কেন তার সিনেমা নিয়ে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা থাকলেও হতাশ হতে হয় না কোনোদিন! 

বিভ্রান্তির গল্পই বলে 'চুরুলি!'

'চুরুলি' শব্দের অর্থ ঘূর্নি। সিনেমার এ গল্পও অদ্ভুত দারুণ এক ঘূর্ণাবর্ত। যেখানে গল্পের প্রোটাগনিস্টরা সময়ের চোরাবালিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। পাশাপাশি বাদ যাচ্ছে না সিনেমার দর্শকেরাও। তারাও দারুণ এক গোলকধাঁধায় পড়ে ক্রমশই অপার্থিব এক সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স এর মুখোমুখি হচ্ছেন। যে এক্সপেরিয়েন্স মালায়ালাম ইন্ডাস্ট্রিতে কেন, অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতেও বেশ বিরল। 'চুরুলি' ক্রমাগত এটাই বুঝিয়ে গিয়েছে, গ্রে ম্যাটারে গল্পের মত গল্প থাকলে, এ গল্প স্তব্ধ করে দিতে পারে সবাইকেই। দর্শককে নাকানিচোবানি খাওয়াতে পারে। শেষে এসে দর্শককে এ প্রশ্ন করতে বাধ্য করতে পারে, যা দেখলাম তা কী স্বর্গ-নরক নিয়ে হাইপোথিসিস? নাকি কোনো ঘোরগ্রস্ত মানুষের ঘামে চিটচিটে স্বপ্ন? একই গোলকধাঁধায় ঘুরলাম বারবার? নাকি, আমিই গোলকধাঁধা? 'চুরুলি'র সার্থকতা এখানে। দর্শকের মস্তিষ্কের সুতোগুলোকে জট পাকানোর কিংবা সাময়িক পক্ষাঘাতগ্রস্ত করার কাজটিই করে যায় লিজু পেলিসারি ও 'চুরুলি।' এবং সিনেমা শেষে তখন তাই অজান্তেই বলতে হয়- এই না হলে সিনেমা! ব্রিলিয়ান্ট। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা